খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা নাজমুল উলফাত দুই মাস ধরে থাইল্যান্ড ভিসার জন্য চেষ্টা করছিলেন। বহু প্রচেষ্টার পর অবশেষে গতকাল রবিবার তিনি ভিসা হাতে পেয়েছেন। নাজমুল বলেন, ‘প্রথমবার বন্ধুদের সঙ্গে থাইল্যান্ড ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু বাকিদের ভিসার মেয়াদ থাকলেও আমার ভিসা না থাকায় আগস্ট মাসে নতুন করে আবেদন করি। তখনও ভিসা পাইনি, ফলে বন্ধুরা আমাকে রেখেই চলে যায়।’
ভিসা জটিলতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমবার না পেয়ে জেদ করে আবার আবেদন করেছিলাম, কিন্তু সেবারও ভিসা মেলেনি। বন্ধুরা বলেছিল থাইল্যান্ডের ভিসা পাওয়া সহজ, কিন্তু কাগজপত্র ঠিক থাকলেও দুবার ব্যর্থ হয়েছি। অবশেষে আজ (গতকাল) ভিসা পেলাম। এখন মনে হয় ভিসা পাওয়া যেন আকাশের চাঁদ।’
তথ্য অনুসারে, থাইল্যান্ডের ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সরকারি সময়সীমা সাত থেকে ১০ কর্মদিবস হলেও বর্তমানে সময় লাগছে ৪৫ থেকে ৫০ দিন। শুধু থাইল্যান্ড নয়, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতেও বাংলাদেশিদের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব দেশের ভিসা প্রক্রিয়া যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি আবেদন প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা নাহিদ ইসলাম নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে গিয়েছি, বিশেষ করে চীন ও থাইল্যান্ডে। আগে ভিসা পাওয়া সহজ ছিল, এখন প্রচুর ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। ভিসা প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল হয়ে গেছে।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জটিলতার মূল কারণ দুই-তিনটি বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে—বিদেশে গিয়ে স্থানীয় আইন না মানা, মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা নিয়েও অবস্থান করা, বেআইনি কাজ করা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়া। এসব কারণে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের জন্য কঠোর শর্ত আরোপ করছে, যা ভিসা প্রাপ্তিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ভিসা নীতির কড়াকড়ির ফলে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মানও নিচে নেমে গেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের গ্লোবাল পাসপোর্ট সূচকে ১০৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০তম, যা বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম দুর্বলতম পাসপোর্ট হিসেবে বিবেচিত।
হেনলি পাসপোর্ট সূচক জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৮টি দেশে ‘ভিসা-অন-অ্যারাইভাল’ সুবিধা পান, যা ২০১৮ সালে ছিল ৪৩টি গন্তব্য। অর্থাৎ ভিসা ছাড়াই প্রবেশের সুযোগ কমেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপ রয়েছে ৫৬তম, ভারত ৮৫তম, ভুটান ৯২তম, শ্রীলঙ্কা ৯৮তম, নেপাল ১০১তম এবং পাকিস্তান ১০৩তম স্থানে। অন্যদিকে ১৯৩টি গন্তব্যে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবাদে সিঙ্গাপুর শীর্ষে আছে। আফগানিস্তান সর্বনিম্ন ১০৬তম স্থানে, যার নাগরিকরা মাত্র ২৪টি গন্তব্যে প্রবেশাধিকার পান।
ট্রাভেল এজেন্সি মালিকরা জানিয়েছেন, থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো পর্যটননির্ভর দেশগুলো এখন কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পর্যটকদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম ভিসা নীতি কঠোর করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় এখন অধিক কাগজপত্র ও উচ্চ ফি-সহ পূর্ব অনুমোদিত ভিসা লাগছে। ভিয়েতনাম নতুন ভিসা কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। এছাড়া ভারত, বাহরাইন, মিসর, দুবাই ও আবুধাবি সাময়িকভাবে ভিসা দেওয়া বন্ধ করেছে। তুরস্ক ও ফিলিপাইন ভিসা প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ ও জটিল করেছে। শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি করছে।
চলতি বছর মালয়েশিয়া শতাধিক বাংলাদেশিকে বহিষ্কার করেছে। দেশটির অভিবাসন কর্মকর্তাদের মতে, অনেকের হোটেল বুকিং জাল ছিল এবং প্রয়োজনীয় অর্থও সঙ্গে ছিল না। এছাড়া কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ভ্রমণ ভিসা ব্যবহার করে কর্মীদের পাঠাচ্ছে, যা নিয়মবহির্ভূত।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, ‘আমাদের পাসপোর্টের দোষ নেই, দোষ আমাদের নিজেদের। যতদিন আমরা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করব, ততদিন পাসপোর্টের মর্যাদাও কমবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিদেশে গিয়ে আইন-কানুন অমান্য করি, অতিরিক্ত সময় থাকি এবং বেআইনি কাজে জড়াই। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আমাদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে। তাছাড়া দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি অস্থিতিশীল, সরকারের ভাবমূর্তি ভালো নয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও টানাপোড়েনে আছে, যার প্রভাব অন্যান্য দেশেও পড়ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান নিচে নেমে গেছে।’
সমাধানের উপায় হিসেবে মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, ‘আমাদের নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। বিদেশে আইন মেনে চলা, ভিসার মেয়াদ শেষ হলে দেশে ফেরা, বেআইনি কাজে জড়ানো থেকে বিরত থাকা—এসব করলে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে আসবে।’
এর আগে গত ৮ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রচুর ভুয়া কাগজপত্র জমা দিই এবং অনিয়মিত অভিবাসনের সংখ্যা আমাদের বেশি। এতে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমাদের নিজেদের ঘর গোছাতে হবে, তাহলেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
খবরওয়ালা/টিএসএন