খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই নভেম্বর ২০২৫, ১০:১১ পিএম
দীর্ঘদিন ধরেই দেশে চাকরি পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়ার মত অবস্থায় পৌছেছে। বিশেষ করে স্বপ্নবাজ তরুণ যারা উচ্চতর শিক্ষা সম্পন্ন করে কর্মসংস্থানে প্রবেশের আশায় অপেক্ষা করছে, তাদেরকে এখন নতুন আরেক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে গিয়ে মানসিকভাবে আঘাতগ্রস্ত হতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর হাতে গোনা কিছু যুবক বিসিএস ক্যাডার বা নন-ক্যাডারভূক্ত সার্ভিসের সুযোগ পেলেও এ সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। ফলে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে খুঁজতে থাকে বেসরকারি বা প্রাইভেট জব। কিন্তু এ কাজেও বেশিরভাগ নিয়োগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। কিন্তু নিয়োগকর্তারা কেন একটিবারও ভাবেনা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেয়া না হলে সেই সুযোগটা তারা কীভাবে পাবে? ফলে একদিকে যেমন সমাজে হতাশাবাদি তরুণ ও অভিভাবকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেইসাথে শিক্ষিত অনেক যুবকদের মধ্যে মাদকাসক্তি সহ অন্যান্য অপরাধের মাত্রাও ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে!
আবার দেশের বেসরকারি সেক্টরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দু’ভাবেই বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়ায় অনেক শিল্প-কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় এখানেও চাকুরির ক্ষেত্র সীমিত হয়ে আসছে। ইতিমধ্যে অনেকেই চাকুরি হারিয়ে বেকার জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। কর্মজীবীরাও ভবিষ্যত ঝুঁকির কথা ভেবে অত্যন্ত চিন্তিত। তার উপর এনজিও সেক্টরের প্রধান দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি’র তহবিল বন্ধ ঘোষণার পর থেকে অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও তাদের তহবিল এদেশে অনেকটা কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়ার পর থেকে প্রায়শই চাকুরি হারাচ্ছে এই সেক্টরের বেশীরভাগ কর্মী। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে এরকম জীবন-জীবিকায়নের সংকটে ক্ষতবিক্ষত দেশের দক্ষ ও অদক্ষ, অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ সব শ্রেণী, পেশার মানুষ।
এরমাঝেও যে একেবারে চাকুরির বিজ্ঞপ্তি নেই তা নয়। কিন্তু সেখানে আবেদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা ধরণের চ্যালেঞ্জ। যে কোন একটি চাকুরি পাওয়ার আগে অনেকগুলো কাজ সম্পন্ন করতে হয় এবং তার জন্য চাকুরি প্রার্থীকে তার ব্যস্ত সময়ের মাঝেও আলাদা করে অনেকখানি সময় বের করে নিতে হয়। যেমনঃ ১. নিয়মিত চাকুরির বিজ্ঞাপনে তীক্ষ্ণ নজর রাখা এবং নিজের অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপযুক্ত চাকুরির অফার খুঁজে পাওয়া। ২. সবকিছু মিললে নিজের বায়োডাটা আপডেট করা ও কাভার লেটার লেখা। ৩. এখনকার বেশিরভাগ চাকুরির আবেদন অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশে ধীরগতির ইন্টারনেটের সহায়তায় এমন আবেদনের পিছনে বেশ কয়েক ঘন্টা সময় ব্যয় করতে হতে পারে। অভিজ্ঞতা যত বেশি, আবেদনে ফিরিস্তিও তখন লিখতে হয় অনেক বেশি। ফলে অনেকক্ষেত্রে পুরো দিনই চলে যেতে পারে অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করতে। ৪. ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন হয়ে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেলে শুরু হয় পরীক্ষা যুদ্ধ। প্রাথমিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হলে (কখনো মৌখিক অথবা লিখিত) আবার ডাকা হয় পরবর্তী পরীক্ষার জন্য (চূড়ান্তভাবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা, অথবা যে কোন একটি পরীক্ষার জন্য)। কিন্তু সেটি নির্ভর করে ঐ সংস্থার নিয়োগ ভাবনার ওপর।
কোন কোন সংস্থার মানব সম্পদ বিভাগ থেকে আবার এই পরীক্ষাগুলোতে অত্যন্ত সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হওয়া উপরের দিকে থাকা ৩/৪ জনকে পাঠানো হয় ঐ সংস্থার ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত টিম (সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম) কিংবা শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট বসের কাছে তার চূড়ান্ত পছন্দ জানার জন্য। মূলত বসের সিদ্ধান্তই এমন নিয়োগে চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান আবার লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার জন্যও আলাদাভাবে ডাকে। এ পর্যায় পর্যন্ত আসলে ধরে নেয়া হয় প্রার্থী একেবারেই নতুন চাকুরি প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে। তখন বাকি থাকে শুধু স্বাস্থ্য পরীক্ষা আর রেফারেন্স চেক। ৫. এতগুলো ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর যদি বুঝতে পারেন যে (কেউ বলবেনা কিন্তু বোঝা যায়), কেবল জেন্ডার বা লৈঙ্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করায় আপনি বাদ পড়েছেন অথবা পূর্ব নির্ধারিত ব্যক্তিকে নেয়ার বৈধতা হিসাবে এতগুলো পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, তখন আপনার মানসিক অনুভূতি কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।
অভিজ্ঞতা থেকে বলছি অনেক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখে এই পদে তারা নারী নাকি পুরুষ অথবা ঐ সংস্থার ভেতর থেকে কাউকে নেবে কিনা! যদিও কাগজে-কলমে বা কোন ডকুমেন্টে এর কোন প্রমাণ কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে কেউ অনুসন্ধান করলে খুঁজে পাবেনা। কেউ চ্যালেঞ্জ করলে তারা তথ্যপ্রমাণ দিয়েই দেখিয়ে দেবে কিভাবে তারা সঠিকভাবে যোগ্য প্রার্থীকেই খুঁজে বের করে নিয়েছে। তাহলে এতসব নাটকের কি দরকার? নারী নিলে শুধু নারীদের, পুরুষ নিলে শুধু পুরুষদের, সংস্থার ভেতর থেকে কাউকে নেয়ার সিদ্ধান্ত থাকলে শুধু অভ্যন্তরীণ প্রার্থীদের আবেদন করতে বলাটাই কী নৈতিকভাবে সমীচীন নয়? কিন্তু বাস্তবতা হল নীতি কথা বলা অনেক নিয়োগকর্তারা সচেতনভাবেই অংশগ্রহণমূলক প্রতিযোগিতার নামে নিয়োগ প্রক্রিয়ার এমন প্রহসনের নাটক হরহামেশাই মঞ্চস্থ করে থাকেন!
অথচ একেকটি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য একেকজন প্রার্থীকে কর্মব্যস্ত সময়ের মধ্যেই তার সুপারভাইজার/বসকে বিভিন্ন অজুহাতের দোহাই দিয়ে ছুটি নিতে হয়, জীবন-জীবিকায়নের জন্য পরিণত বয়সে এসেও প্রচুর প্রস্তুতি নিতে হয়, দূর-দূরান্ত থেকে রাজধানীতে ছুটে আসা প্রার্থীদের আর্থিক দূরাবস্থার মাঝেও প্রতিবার আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া বাবদ কি পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয় তা ভুক্তভোগীরাই কেবল জানে। অথচ নিয়োগের নামে এমন প্রহসন দেখার যেন কেউ নেই! তবে এখানে এ কথাটিও বলা বাঞ্চনীয় – সব প্রতিষ্ঠানই কিন্তু এ রকম নয়। এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা যোগ্যতার মানদণ্ডে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যোগ্য প্রার্থীদের খুঁজে বের করে। ফলে ঢালাওভাবে সবাইকে এমন অপবাদ দেয়া ঠিক হবেনা, বরং যারা নীতি নৈতিকতা বহির্ভূতভাবে এমন নিয়োগ দিয়ে থাকেন এ কথগুলো কেবল তাদের জন্য প্রযোজ্য।
জীবনভর এসব খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি পেতে এবং আরও অনেকের পাশে দাঁড়ানোর বড় পন্থা হতে পারে যুব অবস্থা থেকেই নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। কর্মসংস্থানের একটি বড় অধ্যায় হল আত্মকর্মসংস্থান। যারা উদ্যোক্তা তারা কেবল নিজের দায় নেয় না, তারা সমাজের একটি বড় দায়ও কিন্তু নিজের কাঁধে নিতে পারেন। তাই বেকারত্ব ঘুচাতে চাকুরি করতে হবে – বৈশ্বিক পরিবর্তনধারায় দেশের যুব সমাজের এ মনোভাবে পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। তা না হলে একটি বয়সে এসে হা-পিত্যেস করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা।
তাই যুব উদ্যোক্তা হতে চাইলে সাহসী হয়ে ঝুঁকি নেয়া, লেগে থাকা ও সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আব্দুল কালাম এর ভাষায় – “তুমি যদি তোমার সময়ের মূল্য না দাও, তবে অন্যরাও তা দেবে না। নিজের সময় ও প্রতিভাকে বাজে বিষয়ে নষ্ট করা বন্ধ করো। তাহলে সফল হবেই। সব সময় মনে রাখবে স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমোতে দেয় না।”
লেখক: সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।
মন্তব্য