খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ জানুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং মেধাবীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে নিজ কন্যাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে বিভাগীয় মেধাক্রম ও প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মেধাক্রম লঙ্ঘন
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত বিভাগীয় মেধাতালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ রয়েছে। চুয়েটের তড়িৎ ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশল (ইটিই) বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এই অলিখিত নিয়মটি ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপাচার্যের কন্যা জেরিন তাসনিম মাইমুনা ইটিই বিভাগের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং তাঁর বিভাগীয় মেধাক্রম তৃতীয়। অভিযোগ উঠেছে যে, উচ্চতর মেধাসম্পন্ন প্রার্থীদের বাদ দিয়ে কেবল উপাচার্যের কন্যাকে সুযোগ করে দিতেই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সাজানো হয়েছিল।
নিয়োগ বোর্ড বাতিলের রহস্য
২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর ইটিই বিভাগে দুইজন প্রভাষক নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। সেখানে ১৮তম ব্যাচের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মেধাবী শিক্ষার্থীরা আবেদন করেন এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ ছাড়াই নিয়োগ বোর্ডটি বাতিল করা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, তৎকালীন সময়ে উপাচার্যের কন্যা নিয়োগের যোগ্যতা অর্জন না করায় বা প্রস্তুত না থাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিলম্ব করা হয়েছিল।
নতুন বিজ্ঞপ্তি ও বিতর্কিত নিয়োগ
পরবর্তীতে ২৫ জুলাই ২০২৫ তারিখে পুনরায় তিনটি প্রভাষক পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এবার ১৮তম ব্যাচের প্রথম স্থান অধিকারী প্রার্থী পুনরায় আবেদন করলেও তাঁকে রহস্যজনকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরিবর্তে ১৯তম ব্যাচের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অধিকারী উপাচার্যের কন্যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ১৮তম ব্যাচের শীর্ষ মেধাবী শিক্ষার্থী দ্বিতীয়বারের মতো বঞ্চিত হন।
নিচে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অসামঞ্জস্যতা সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| বিজ্ঞপ্তির তারিখ | পদের সংখ্যা | আবেদনকারী মেধাবীদের ব্যাচ | গৃহীত পদক্ষেপ ও ফলাফল |
|---|---|---|---|
| ১১ নভেম্বর, ২০২৪ | ০২ | ১৮তম ব্যাচ (১ম ও ২য় স্থান) | সকল পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর বোর্ড বাতিল। |
| ২৯ জুলাই, ২০২৫ | ০৩ | ১৮ ও ১৯তম ব্যাচ | ১৮তম ব্যাচের ১ম স্থান অধিকারীকে বর্জন। |
| চূড়ান্ত ফলাফল | ০৩ | ১৯তম ব্যাচ | ১ম, ২য় ও উপাচার্যের কন্যা (৩য় স্থান) নিয়োগপ্রাপ্ত। |
শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী একে ‘ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে মেধা হওয়া উচিত একমাত্র মাপকাঠি, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সততার পরিপন্থী। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চুয়েটের একাডেমিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা সংকটের মুখে পড়েছে।
শিক্ষাবিদগণ মনে করছেন, একজন উপাচার্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি করে। শিক্ষার্থীরা এখন বিতর্কিত এই নিয়োগ বাতিল, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং মেধাভিত্তিক স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।