খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রবর্তিত ‘ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নন-লাইফ বীমা খাতে চতুর্থ স্থান অর্জন করা গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসির আর্থিক অবস্থার ক্রমাবনতি সত্ত্বেও এমন সম্মাননা প্রদান নিয়ে খোদ বীমা সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই বিস্ময় দেখা দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি অনুযায়ী, সুশাসন ও সামগ্রিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে এই পুরস্কার দেওয়া হলেও কোম্পানিটির বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা।
গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোম্পানিটির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকই বর্তমানে নিম্নমুখী। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ৪১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা এর আগের বছর ২০২৩ সালে ছিল ৪৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রিমিয়াম সংগ্রহ কমেছে ৪৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা প্রায় ৯.৬১ শতাংশ। প্রিমিয়াম কমে যাওয়ার এই প্রবণতা একটি বীমা কোম্পানির সক্ষমতা হ্রাসের প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়।
নিচে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অবস্থার একটি তুলনামূলক সারণি তুলে ধরা হলো:
| আর্থিক সূচক | ২০২৩ সাল (কোটি টাকা) | ২০২৪ সাল (কোটি টাকা) | পরিবর্তনের হার (%) |
| গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ | ৪৫৪.৫০ | ৪১০.৮০ | – ৯.৬১% |
| মোট বিনিয়োগ | ৪১৬.৭০ | ৩৬৫.৮০ | – ৭.৬১% |
| মোট রিজার্ভ | ৪১৬.৭০ | ৩৬৫.৮০ | – ১২.২২% |
| সলভেন্সি মার্জিন (AS) | ২০৬.৫০ | ১৪৯.২০ | – ২৭.৭৫% |
| আন্ডাররাইটিং প্রফিট | ১২০.৩০ (২০২১) | ৯৬.৯০ | – ৭.৭১% (৩ বছরে) |
আর্থিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে রহস্যজনক দিক হলো কোম্পানিটির আন্ডাররাইটিং প্রফিট বা বীমা অবলিখন মুনাফা। সাধারণত বীমা দাবি পরিশোধের হার বাড়লে মুনাফা কমে। কিন্তু গ্রীন ডেল্টার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে দাবি পরিশোধের হার কম থাকা সত্ত্বেও আন্ডাররাইটিং প্রফিট উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই অসামঞ্জস্যতা কোম্পানিটির আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাবকে ইঙ্গিত করে।
এছাড়া একটি বীমা কোম্পানির আর্থিক শক্তির সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো তার ‘সলভেন্সি মার্জিন’ বা দায় পরিশোধের সক্ষমতা। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির অ্যাভেইলেবল সলভেন্সি (AS) কমে দাঁড়িয়েছে ১৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭.৭৫ শতাংশ কম। সলভেন্সি মার্জিনের এই বড় পতন গ্রাহকদের বিমা দাবি মেটানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি এবং ভালো কাজের মূল্যায়নে আইডিআরএ মোট ১৩টি লাইফ ও নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানকে এই এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। আগামী ২৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। তালিকায় গ্রীন ডেল্টার নাম আসায় প্রশ্ন উঠেছে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি আর্থিক সচ্ছলতার চেয়ে কেবল প্রশাসনিক ভাবমূর্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে?
এই অসামঞ্জস্যতা নিয়ে আইডিআরএ-র মুখপাত্র বা গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। আর্থিক সূচকের এমন উদ্বেগজনক পতনের মাঝে এই সম্মাননা বীমা খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বদলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।