খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হলে তা কেবল দ্বিপক্ষীয় সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত এক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাহ্যিক হুমকি দিয়ে ইরানকে ভীত করা যাবে না এবং যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন বা সামরিক মহড়ার প্রদর্শন ইরানি জাতির মনোবল ভাঙতে সক্ষম নয়।
পরমাণু কর্মসূচি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ার মধ্যেই এই হুঁশিয়ারি এলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানকে নতুন করে একটি পরমাণু চুক্তিতে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়ে সামরিক বিকল্পের কথাও উল্লেখ করেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে তেহরানের ওপর রাজনৈতিক চাপ। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নৌ উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে জোরদার করেছে। খামেনি বলেন, ইরান কোনো যুদ্ধ শুরু করতে আগ্রহী নয়; তবে দেশটির ওপর আঘাত এলে প্রতিরোধ হবে কঠোর ও সুসমন্বিত।
তেহরান কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার কথা জানালেও একটি স্পষ্ট শর্ত দিয়েছে—আলোচনার নামে ইরানের প্রতিরক্ষাসক্ষমতা খর্ব করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য হবে না। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রচারণার বাইরে কাঠামোগতভাবে সংলাপের প্রস্তুতি এগোচ্ছে। মস্কোতে রুশ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের পর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দেন। একই সময়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগে বড় ধরনের সংঘাতকে উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর বলে অভিহিত করেন।
মাঠপর্যায়ে সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার হয়েছে। ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেন, তাঁর বাহিনী পূর্ণ সামরিক ও রক্ষণাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে আছে। তাঁর মতে, যে কোনো ভুল পদক্ষেপ কেবল ইরানের নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ মোতায়েন পরিস্থিতির উত্তাপ বাড়িয়েছে, যা তেহরানের দৃষ্টিতে সরাসরি শক্তি প্রদর্শনের শামিল।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ উপস্থিতির সারসংক্ষেপ
| নৌযানের ধরন | মোতায়েন সংখ্যা |
|---|---|
| ডেস্ট্রয়ার | ৬টি |
| বিমানবাহী রণতরি | ১টি |
| উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজ | ৩টি |
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইরান বড় চাপে রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে খামেনি “রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্র” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এসব আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে দুর্বল করা। সরকারি পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অনেক বেশি প্রাণহানির তথ্য তুলে ধরেছে। এই ভিন্নমতপূর্ণ পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
কাতারসহ কয়েকটি আঞ্চলিক রাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি শক্তি প্রদর্শনের এই সমান্তরাল ধারা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই আলোচনার দরজা খোলা রাখলেও ভুল হিসাব বা আকস্মিক সামরিক ঘটনার ঝুঁকি রয়ে গেছে। ফলে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন এমন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য বিচ্যুতিই পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।