খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
“যদি কখনও স্মরণে আসি তবে ডেকো আমায়,
আমি তো অতীতকাল নই যে ফিরে আসতেই পারব না।”
মির্জা গালিব স্মরণে..
গজল তরঙ্গের মহান উৎস কবি — মির্জা গালিব
উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের আকাশে যে নক্ষত্র আজও সমান দীপ্ত, তিনি মির্জা গালিব। তাঁর কবিতায় যেমন প্রেমের অনন্ত ব্যাকুলতা, তেমনি আছে দার্শনিক বোধ, আত্মসমালোচনা, সময়ের ইতিহাস ও মানুষের অন্তর্লৌকিক যন্ত্রণার সূক্ষ্ম প্রকাশ।
জন্ম ও পরিচয়
পূর্ণ নাম মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব। জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৭৯৭ সালে, তৎকালীন আগ্রায় (বর্তমান আগ্রা)। শৈশবেই পিতৃহারা হন। অল্প বয়সে বিবাহিত জীবন শুরু হলেও তাঁর জীবনের বড় অংশ কেটেছে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যে।
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে এক কবি
গালিব ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তমিত সূর্যের সাক্ষী। তাঁর জীবনকালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব বিস্তার পায়, এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ মুঘল শাসনের অবসান ঘটায়। সেই অস্থির সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত তিনি তাঁর চিঠি ও গদ্যে জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর পত্রাবলি উর্দু গদ্যের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
কাব্যধারা ও বৈশিষ্ট্য
গালিবের গজল শুধু প্রেমের কাব্য নয়; তা অস্তিত্বের প্রশ্ন, নিয়তি, ঈশ্বর, আত্মপরিচয় ও মানব-অন্তরের দ্বন্দ্বের গভীর অনুসন্ধান। তাঁর ভাষা অলংকারময়, কিন্তু ভাব গভীর ও বহুমাত্রিক।
তাঁর বিখ্যাত শেরগুলোর একটি—
“হাজারোঁ খোয়াহিশেঁ এমন যে হার খোয়াহিশ পে দম নিকলে,
বহুত নিকলে মেরে আরমান, লেকিন ফির ভি কম নিকলে।”
তিনি ফারসি ভাষাতেও সমান পারদর্শী ছিলেন এবং নিজেকে মূলত ফারসি কবি বলেই ভাবতেন। তবে ইতিহাস তাঁকে উর্দু সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন হিসেবে অমর করে রেখেছে।
জীবনযাপন ও স্বীকৃতি
গালিব কখনো নিয়মিত পেশায় যুক্ত হননি। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজকীয় ভাতা, বন্ধুদের সহায়তা কিংবা ঋণের উপর নির্ভর করে কাটিয়েছেন। আর্থিক সংকট, পারিবারিক শোক—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামমুখর।
তাঁর জীবদ্দশায় তিনি কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু নিজের সম্পর্কে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—
একদিন পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে যথাযথ মর্যাদা দেবে।
ইতিহাস সেই বিশ্বাসের সত্যতা প্রমাণ করেছে।
মৃত্যু ও চিরনিদ্রা
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ সালে দিল্লিতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার-এর নিকটে। আজও তাঁর সমাধি সাহিত্যপ্রেমীদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।