আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক লেনদেনের বিস্তারের সঙ্গে বাংলাদেশের মুদ্রাবাজারেও বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী এবং বিদেশে অর্থ পাঠানো বা গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিনের মুদ্রার দর গুরুত্বপূর্ণ। ডলার, ইউরো, পাউন্ড থেকে শুরু করে ভারতীয় রুপি, সৌদি রিয়াল কিংবা কুয়েতি দিনার—প্রতিটি মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মূল্য বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাবে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ১৫ পয়সা। একই দিনে ইউরোর দর ১৪০ টাকা ১৪ পয়সা এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের দর ১৬৩ টাকা ১ পয়সা। এ ছাড়া কানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান ডলার, চীনা ইয়েন, সিঙ্গাপুরি ডলার, ভারতীয় রুপি এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রারও নির্ধারিত দর রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বরের বৈদেশিক মুদ্রার দর
| মুদ্রার নাম | বাংলাদেশি টাকায় দর |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২৩ টাকা ১৫ পয়সা |
| ইউরো | ১৪০ টাকা ১৪ পয়সা |
| পাউন্ড স্টার্লিং | ১৬৩ টাকা ০১ পয়সা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৭ টাকা ৩০ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৬ টাকা ৬৪ পয়সা |
| চীনা ইয়েন | ১৮ টাকা ৩৪ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৬ টাকা ১৮ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৮ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ২৪ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৮১ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৭৩ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৯ টাকা ৩৯ পয়সা |
| সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৬০ পয়সা |
ডলারের বাজারে সাম্প্রতিক পরিবর্তন
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে মার্কিন ডলারের দর। বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে নিষ্পত্তি হওয়ায় এর দামের ওঠানামার প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন স্তরে পড়ে।
কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর ১২২ টাকা ৮৫ পয়সার আশপাশে ছিল। পরে ডলারের দর বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় ওঠে। এরপর আবার কিছুটা কমে ২৪ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ১২৩ টাকা ১৫ পয়সায় নেমেছে।
ডলারের দরে এই ওঠানামা আমদানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশ থেকে পণ্য বা কাঁচামাল আমদানির সময় ডলারের দাম বাড়লে একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। বিপরীতে দর কমলে টাকার হিসাবে আমদানি ব্যয়ের ওপর কিছুটা চাপ কমতে পারে।
আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের প্রভাব
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন শর্ত ও নীতি সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়ার মধ্যেও ডলারের দরে ওঠানামা দেখা গেছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ডলারের দর নির্ধারণের পেছনে একাধিক বিষয় কাজ করে। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও জোগান, আমদানির পরিমাণ, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব মুদ্রার দরে পড়তে পারে।
এ কারণে এক দিনের বিনিময় হার দিয়ে পুরো বাজারের প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। দিনের বিভিন্ন সময়েও লেনদেনের হার পরিবর্তিত হতে পারে।
রেমিট্যান্সে নজর বাজারসংশ্লিষ্টদের
বৈদেশিক মুদ্রার জোগানের ক্ষেত্রে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকলে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক থাকায় আনুষ্ঠানিক ও খোলাবাজারের বিনিময় হারের ব্যবধানও আগের তুলনায় কমেছে। তবে বাজারের পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে এই ব্যবধান আবারও বাড়তে বা কমতে পারে।
রপ্তানি আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে আমদানির জন্য ডলারের চাহিদা বাড়লে বাজারে তার প্রভাব পড়ে। ফলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্য মুদ্রার দরের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি করে।
কারা বেশি প্রভাবিত হন
বৈদেশিক মুদ্রার দর পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ওপর। আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে ডলারের দর বাড়লে পণ্য, কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতি আমদানির টাকার অঙ্কও বেড়ে যেতে পারে। আবার রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রায় পাওয়া অর্থ দেশে আনার সময় বিনিময় হারের পরিবর্তন টাকার হিসাবে তাদের আয়কে প্রভাবিত করতে পারে।
বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভ্রমণ বা অন্যান্য প্রয়োজনে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠানোর সময় কোন বিনিময় হারে টাকা পাওয়া যাবে, সেটিও তাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে এখানে প্রকাশিত হারকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের নির্দেশক হিসেবে দেখা উচিত। ব্যাংক, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রকৃত হার লেনদেনের ধরন, সময় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত হারের কারণে ভিন্ন হতে পারে।
তাই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা বা রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ বিনিময় হার জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
নোট: প্রতিবেদনে দেওয়া মুদ্রার হার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনশীল হওয়ায় দিনের বিভিন্ন সময়ে এসব দর পরিবর্তিত হতে পারে।


