ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন বাড়ছে ৫ গুণ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি তাদের অনুমোদিত মূলধন পাঁচ গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান ২ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ১০ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠা, মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বিদেশি কৌশলগত বিনিয়োগকারী যুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে শেয়ারধারীদের এ তথ্য জানায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ডিএসইতে প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের সংঘস্মারকে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তবে পর্ষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত নয়। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) শেয়ারধারীদের সম্মতিও প্রয়োজন হবে। সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরই নতুন মূলধন কাঠামো কার্যকর করা সম্ভব হবে।

ব্যাংকটির একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এস আলম গ্রুপের সময়কার বিভিন্ন অনিয়মের প্রভাব সামাল দিতে গিয়ে ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে বড় ধরনের মূলধন সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি কোনো কৌশলগত বিনিয়োগকারীকে ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আশা করছে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের এই সিদ্ধান্তে অনুমোদন দেবে।

লোকসানের চাপে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা

অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সময়েই ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চলতি পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম নয় মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক কর-পরবর্তী নিট লোকসান করেছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে ব্যাংকটি প্রায় ৭৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।

অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানেই ব্যাংকটির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বিপুল অঙ্কের লোকসান ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করছে।

ব্যাংকটির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, লোকসানের কারণে নিট সম্পদমূল্যেও উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকের নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট সম্পদমূল্য কমেছে ৩ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা, যা প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও। সাধারণত একটি ব্যাংকের নিট সম্পদমূল্য তার আর্থিক অবস্থান ও শেয়ারধারীদের জন্য বিদ্যমান সম্পদের পরিমাণ বোঝার অন্যতম সূচক। এই সূচকে বড় ধরনের পতন বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

লভ্যাংশ বন্ধ, জেড শ্রেণিতে ইসলামী ব্যাংক

আর্থিক সংকটের কারণে ২০২৩ সালের পর থেকে শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি ইসলামী ব্যাংক। ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে পুঁজিবাজারে ব্যাংকটি বর্তমানে জেড শ্রেণিভুক্ত। এতে ব্যাংকটির শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

শেয়ারবাজারে কোনো কোম্পানির শ্রেণি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান, আর্থিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জেড শ্রেণিতে থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেন। ফলে ইসলামী ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধির উদ্যোগ ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ আর্থিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এস আলম গ্রুপের সময়কার ঋণ অনিয়মের প্রভাব

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের পেছনে এস আলম গ্রুপের সময়কার ঋণ অনিয়মকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এবং বেনামেও ব্যাংকটি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ব্যাংকটি থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা তুলে নেয় গ্রুপটি। এসব ঋণের বড় অংশ বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে। বিপুল অঙ্কের ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের তারল্য, সম্পদের গুণগত মান এবং মূলধনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারায় এস আলম গ্রুপ। এরপর ব্যাংকটির পরিচালনায় পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ অবস্থায় অনুমোদিত মূলধন ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগকে ব্যাংকটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অনুমোদিত মূলধন বাড়ানো মানেই ব্যাংকের হাতে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন অর্থ আসা নয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন শেয়ার ইস্যু বা বিনিয়োগ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাস্তবে মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য নতুন বিনিয়োগ, খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

বিদেশি কৌশলগত বিনিয়োগকারী যুক্ত করা সম্ভব হলে ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম ও লোকসানের চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে ইসলামী ব্যাংক এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। অনুমোদিত মূলধন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সেই প্রচেষ্টার একটি অংশ। তবে ব্যাংকটির আর্থিক পুনরুদ্ধার কতটা দ্রুত হবে, তা নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগের ওপর।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।