চট্টগ্রামে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় মৎস্যখাতে ৯১ কোটি টাকার ক্ষতি

টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের মৎস্যখাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মৎস্যঘের, পুকুর ও দিঘি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। চাষ করা সব মাছ ও পোনা ভেসে যাওয়ায় মৎস্য চাষিদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। অনেক চাষি ব্যাংক ঋণ ও ধারদেনা করে মাছ চাষ করেছিলেন, যা এই বন্যায় ভেসে যাওয়ায় তারা এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব।

শনিবার চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত এক জরুরি জরিপ প্রতিবেদনে এই ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়াসহ ১৫টি উপজেলায় এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা টানা বৃষ্টিতে এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা মৎস্য দপ্তরের দেওয়া সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো।

উপজেলাভিত্তিক জলাশয় প্লাবিত হওয়া ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ

ক্র. নং. উপজেলার নাম প্লাবিত জলাশয়ের সংখ্যা (পুকুর/ঘের) আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ (টাকা)
বাঁশখালী সর্বোচ্চ প্লাবিত অঞ্চল ৪১ কোটি ৫০ লাখ
সাতকানিয়া ৩,০০০-এর বেশি (লোহাগাড়াসহ) ১১ কোটি
লোহাগাড়া ৩,০০০-এর বেশি (সাতকানিয়াসহ) ৮ কোটি ৫০ লাখ
কর্ণফুলী ৫৫৭টি ৬ কোটি
চন্দনাইশ ৩৮৩টি ৬ কোটি
পটিয়া ১,৪৩৫টি জেলা গড় হিসাবভুক্ত
আনোয়ারা ১,১০০টি জেলা গড় হিসাবভুক্ত
খাতভিত্তিক অবকাঠামো সামগ্রিক বাঁধ ও নেট ৮৬ লাখ ৫০ হাজার
মাছের পোনা খাত ৬০ লাখ টন পোনা ২৩ কোটি
১০ উৎপাদিত মাছ খাত ৩,১২৩ টন মাছ ও ৫৭০ টন চিংড়ি ৬৫ কোটি

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর কার্যালয়ের এই জরিপ অনুযায়ী, বানের পানিতে চট্টগ্রামের মোট ৪ হাজার ১১১ হেক্টর আয়তনের ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও জলাশয় প্লাবিত হয়েছে। এর বাইরে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা ৩২০টি বড় মাছের ঘের পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া। এই দুই উপজেলায় তিন হাজারেরও বেশি পুকুর ও জলাশয় পুরোপুরি পানির নিচে চলে গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, চলতি মাসের ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার সবকটিতেই মৎস্য খাতে বড় আঘাত এসেছে। প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৯১ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি রেকর্ড করা হয়েছে। পানি কমলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও সুনির্দিষ্ট হবে।

সরকারি হিসাবমতে, বানের জলে ভেসে গেছে ৩ হাজার ১২৩ টন বিভিন্ন প্রজাতির বড় মাছ। এছাড়া দেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম অনুষঙ্গ ৫৭০ টন চিংড়ি বন্যার পানিতে খামার থেকে বেরিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে পোনা মাছের ক্ষেত্রে; প্রায় ৬০ লাখ টন বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা ভেসে গেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৩ কোটি টাকা। অবকাঠামোগতভাবে মৎস্য ঘেরের বাঁধ, চারপাশের জাল ও শেড ভেঙে ক্ষতি হয়েছে আরও ৮৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার। এই বিপুল পরিমাণ লোকসান কাটিয়ে মৎস্য চাষিরা কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াবেন, তা নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা এখন সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণের জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছেন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।