বগুড়ার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ চলে গেলে ভর্তি রোগীদের জন্য ফ্যান চালানোর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও সেটি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনার বরাদ্দ না থাকায় নিয়মিত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে গরম ও লোডশেডিংয়ের সময় বিশেষ করে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। রোগীদের স্বজনদেরও বাধ্য হয়ে হাতপাখা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাতাস করতে হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নারী ও পুরুষ ওয়ার্ড ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ওয়ার্ডের বৈদ্যুতিক পাখাগুলো থেমে যায়। গরম ও ভ্যাপসা পরিবেশে রোগীদের অনেকেই অস্বস্তিতে পড়েন। তাঁদের স্বজনদের কেউ তালপাখা, আবার কেউ প্লাস্টিকের হাতপাখা দিয়ে রোগীদের বাতাস করতে দেখা যায়।
৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল শুক্রবার রাত ৮টা পর্যন্ত নারী ও পুরুষ ওয়ার্ড মিলিয়ে ৫৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। অর্থাৎ নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি ছিল। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ওয়ার্ডে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ফ্যান বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ে।
পুরুষ ওয়ার্ডের ৪৪ নম্বর বিছানায় শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন উপজেলার গোপালপুর গ্রামের আবদুস সামাদ (৫০)। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর গরমে তাঁর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। তখন স্বামীকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য হাতপাখা নিয়ে পাশে বসেন স্ত্রী চম্পা বেগম। দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস করতে করতে একপর্যায়ে তিনিও ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
চম্পা বেগম বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনা ঘটে। এ সময় গরমে তাঁর স্বামীর শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। স্বস্তি দিতে তাঁকে দীর্ঘ সময় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হয়। এতে তিনিও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন।
আবদুস সামাদের মতো অন্য রোগীরাও লোডশেডিংয়ের সময় একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডে থাকা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যুৎ চলে গেলে গরমে ওয়ার্ডের পরিবেশ দ্রুত অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। দিনের তুলনায় রাতে সমস্যাটি বেশি অনুভূত হয়। কারণ রাতে দীর্ঘ সময় ধরে কৃত্রিম বাতাসের ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের ঘুম ও বিশ্রাম ব্যাহত হয়।
হাসপাতালের নার্স নাজনীন আক্তার জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে শক্তি-সাশ্রয়ী বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অন্ধকারের সমস্যা কিছুটা সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু ফ্যান চালানোর বিকল্প ব্যবস্থা নেই। তাই বিদ্যুৎ না থাকলে রোগীদের গরমের মধ্যেই থাকতে হয়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, জরুরি বিভাগে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ যন্ত্রের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে জরুরি বিভাগে ফ্যান ও বাতি চালানো যায়। অস্ত্রোপচারকক্ষের জন্যও জেনারেটর রয়েছে। তবে সেই জেনারেটর সাধারণত জরুরি প্রয়োজনের সময় চালু করা হয়। ওয়ার্ডে নিয়মিত ফ্যান চালানোর জন্য জেনারেটর ব্যবহার করা সম্ভব হলেও জ্বালানি সংগ্রহের অর্থ না থাকায় সেটি নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না।
হাসপাতালের এমন পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার মানের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক সাফল্যের প্রেক্ষাপটে। শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ২০২৪ ও ২০২৬ সালে দেশের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে প্রথম স্থান অর্জন করেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। চিকিৎসাসেবা ও ব্যবস্থাপনায় এমন সাফল্যের পরও রোগীদের মৌলিক স্বস্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকা বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে গরমের সময়ে রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর তাপমাত্রা ও বায়ু চলাচলের পরিবেশের প্রভাব পড়তে পারে। শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগী, প্রবীণ ব্যক্তি, শিশু এবং দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর পরিবেশ আরও কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। তাই বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলেও সেটি সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করা হাসপাতালের দৈনন্দিন সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, জেনারেটর থাকলেও সেটির জ্বালানি কেনার জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডগুলোতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় ফ্যান চালানো সম্ভব হবে।
ফলে হাসপাতালে জেনারেটর থাকার পরও সেটি কাজে না লাগার বিষয়টি এখন রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে লোডশেডিংয়ের সময় অন্তত ওয়ার্ডে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। এতে চিকিৎসাধীন রোগীদের কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে এবং হাসপাতালের বিদ্যুৎ-নির্ভর সেবাব্যবস্থাও আরও কার্যকর হবে।


