ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ : আগস্টেই হাসপাতালে ১৩ হাজারের বেশি, বাড়ছে চাপ

বর্ষার মৌসুমে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন করে শত শত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে রোগীর সংখ্যা বাড়ায় হাসপাতালগুলোর ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। বিশেষ করে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগী আসায় চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৮৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন পাঁচজন। এ নিয়ে চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৯২৯ জনে। এ সময় পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৮২ জনের। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন ২৬ হাজার ৮৯৭ জন।

চলতি বছরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪ এবং জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুলাইয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ৯ হাজার ২০৬ জন এবং মারা যান ৩৬ জন।

আগস্টে সংক্রমণের গতি আরও বেড়েছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত এ মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী। ফলে বর্ষার এই সময়ে রোগীর চাপ দ্রুত বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য আরও বড় চাপ সামলানোর প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

এক দিনে সর্বোচ্চ ৮৩৯ রোগী ভর্তি

২৩ আগস্টের আগের ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৮৩৯ জন রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৮৭ জন, খুলনায় ১৫৯, বরিশালে ১১৭, চট্টগ্রামে ১০০, ময়মনসিংহে ৭৯, রাজশাহীতে ৭১, রংপুরে ২৩ এবং সিলেট বিভাগে তিনজন রয়েছেন।

চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর হিসাবে ৮৩৯ জনের এই সংখ্যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। একই দিনে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া পাঁচজনের চারজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা।

এই চিত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন শুধু রাজধানী বা ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোগী বাড়ছে এবং আঞ্চলিক পর্যায়েও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

বর্ষার সঙ্গে বাড়ছে এডিসের প্রজননস্থল

ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে এ মশা বংশবিস্তার করে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের সামগ্রী, নির্মাণাধীন ভবনের গর্ত, ছাদের বিভিন্ন অংশ কিংবা পানির ট্যাংকের আশপাশে জমে থাকলে সেগুলো এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।

শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ এবং নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি অপসারণ না করার কারণে এ ধরনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে শুধু মশকনিধনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে তা ধ্বংস করা এবং নিয়মিত নজরদারি চালানো জরুরি। একটি এলাকায় ওষুধ ছিটানোর পরও যদি বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পানি জমে থাকে, তাহলে সেখান থেকে আবারও এডিস মশার বিস্তার ঘটতে পারে।

ঢাকামুখী রোগীতে বাড়ছে হাসপাতালের চাপ

ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ার পাশাপাশি ঢাকার হাসপাতালগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ও পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকা, গুরুতর রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শের কারণে অনেক রোগীকেই রাজধানীমুখী হতে হচ্ছে।

তবে ডেঙ্গুর চিকিৎসার বড় একটি অংশ জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেই করা সম্ভব। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তরল ও অন্যান্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকায় স্থানান্তরের প্রয়োজন হয় না। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোকে ডেঙ্গু মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাসপাতালগুলোতেও বাড়াতে হবে প্রস্তুতি

রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত শয্যা, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গুরুতর রোগী দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। জেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও কমানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ ধীরে ধীরে বেড়ে বর্ষার সময় এসে বড় আকার নিয়েছে। গত বছরও দেশে ডেঙ্গুর ব্যাপক সংক্রমণ হয়েছিল। ২০২৫ সালে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।

সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ কঠিন

ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। যেসব এলাকায় একসঙ্গে বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেসব এলাকায় দ্রুত নজরদারি বাড়িয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস করা জরুরি।

সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষকেও এ কাজে যুক্ত হতে হবে। বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের আশপাশে পানি জমছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করা প্রত্যেকের দায়িত্বের অংশ হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশকনিধন কার্যক্রম চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন। নিয়মিত নজরদারি, আক্রান্ত এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

বর্ষার বাকি সময়ে বৃষ্টিপাত ও জমে থাকা পানির কারণে এডিস মশার বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ার আগেই চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Tags :

ratul Khaborwala

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।