সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই-ভিত্তিক বিমান সংস্থা এমিরেটস বিশ্বখ্যাত বীমা কোম্পানিগুলোর সাথে যৌথভাবে দুবাইগামী এবং দুবাই হয়ে অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্য একটি বিশেষ ভ্রমণ বিমা (Travel Insurance) চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে বিভিন্ন দেশের জারি করা ভ্রমণ সতর্কতার ফলে সাধারণ বিমা পলিসিগুলোর কার্যকারিতা বাতিলের সমস্যা দূর করতেই মূলত এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এমিরেটস প্রধানের বক্তব্য ও বিমার উদ্দেশ্য
এমিরেটসের প্রেসিডেন্ট টিম ক্লার্ক গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে একটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে এই নতুন উদ্যোগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি এই বিশেষ ভ্রমণ বিমা পণ্যটিকে “যৌক্তিক মূল্যের” বা সাশ্রয়ী বলে বর্ণনা করেছেন। টিম ক্লার্ক আশ্বস্ত করে জানান, এই বিমা পলিসিটি গ্রহণ করলে যাত্রীদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা থাকবে; এমনকি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফিরতি ফ্লাইটটি এমিরেটসের পরিবর্তে অন্য কোনো বিমান সংস্থার হলেও এই বিমা সুবিধা কার্যকর থাকবে।
টিম ক্লার্কের ভাষ্যমতে, “যাত্রীদের অন্যতম বড় একটি উদ্বেগ হলো, তারা যদি কোনো কারণে বিদেশে গিয়ে আটকা পড়েন এবং দেশে ফিরতে না পারেন, তবে কী হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, যাত্রীদের এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই বিমান সংস্থাটি বিমাকারীদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে।
সাধারণ বিমা পলিসির কার্যকারিতা লোপ ও সুরক্ষা সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর তিন মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এর ফলে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ এখনও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘নো-ফ্লাই’ বা বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ সংক্রান্ত সতর্কবার্তা বহাল রেখেছে। আর এই সরকারি সতর্কবার্তার কারণে সাধারণ বা স্ট্যান্ডার্ড ভ্রমণ বিমা পলিসিগুলো নতুন বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। কারণ, বেশিরভাগ সাধারণ বিমা নীতিমালায় যুদ্ধ ও সংঘাতজনিত পরিস্থিতি বর্জনের স্পষ্ট ধারা বা এক্সক্লুশন (Exclusion) যুক্ত থাকে।
যদিও কিছু বিশেষায়িত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ বিমা কভারেজ বাজারে উপলব্ধ রয়েছে, তবে সেগুলোর প্রিমিয়ামের হার অত্যন্ত চড়া এবং শর্তাবলীও অনেক বেশি কঠোর। এর ফলে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সুরক্ষার একটি বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা অনেক যাত্রী কেবল ক্লেইম বা বিমার অর্থ দাবি করার সময়েই জানতে পারেন।
যাত্রী সংখ্যা ও এমিরেটসের যুদ্ধ ঝুঁকি কভারেজ খরচ
চলমান সংঘাত ও বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০,০০০ যাত্রী দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট নিচ্ছেন। সংঘাত শুরুর আগে এই সংখ্যা ছিল দৈনিক প্রায় ১০০,০০০। তবে বর্তমানের এই ৪০,০০০ যাত্রী ট্রানজিটের হারও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। টিম ক্লার্ক উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ বিমা সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও লন্ডন থেকে দুবাইগামী কিছু ফ্লাইট যাত্রীতে সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ থাকছে।
অন্যদিকে, নিজস্ব বহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমিরেটসকে প্রতি সপ্তাহে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম গুনতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের সম্পূর্ণ বিমান বহর সচল রাখতে এমিরেটসকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০০,০০০ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত যুদ্ধ ঝুঁকি কভারেজ (War Risk Coverage) প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। একজন বিমা খাতের নির্বাহী এই প্রিমিয়ামের হারকে “অস্বাভাবিক রকমের কম” বলে অভিহিত করেছেন। এর তুলনায় অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী বিমান সংস্থাগুলোকে এই অঞ্চলে ল্যান্ডিং করা প্রতিটি একক ফ্লাইটের জন্যই ৭০,০০০ থেকে ১৫০,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়ামের কোটেশন বা প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
এমিরেটসের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় এমিরেটস তাদের বিমান পরিষেবা সফলভাবে পুনরায় সচল করতে সক্ষম হয়েছিল এবং দ্রুততম সময়ে তাদের মোট ধারণক্ষমতার ৪০ শতাংশে ফিরে আসে। টিম ক্লার্ক জানান, দুবাইয়ের দিকে ধেয়ে আসা প্রায় ৩,০০০ ড্রোন, মিসাইল এবং ক্রুজ মিসাইলের প্রায় ৯৮ শতাংশই মাঝআকাশে সফলভাবে ভূপাতিত বা প্রতিহত করা হয়েছে। বর্তমানে সামরিক জেট বিমান দ্বারা টহলকৃত অত্যন্ত সংকীর্ণ এয়ার করিডোর বা আকাশসীমা ব্যবহার করে এই বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। সংঘাতের প্রাথমিক দিনগুলোতে যেকোনো জরুরি পথ পরিবর্তনের (Diversion) ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য প্রতিটি ফ্লাইটে অতিরিক্ত পাঁচ ঘণ্টার জ্বালানি বহন করা হতো।
একনজরে এমিরেটসের বিশেষ বিমা উদ্যোগ ও বর্তমান পরিস্থিতি
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য |
| উদ্যোক্তা বিমান সংস্থা | এমিরেটস (দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত) |
| বিমার ধরণ | দুবাইগামী ও ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য বিশেষ ভ্রমণ বিমা |
| উদ্যোগ ঘোষণার তারিখ | ১১ জুন, ২০২৬ (সাক্ষাৎকার প্রকাশের তারিখ) |
| দুবাইয়ে বর্তমান দৈনিক ট্রানজিট যাত্রী | প্রায় ৪০,০০০ জন (যা ক্রমান্বয়ে বর্ধনশীল) |
| সংঘাতপূর্ব দৈনিক ট্রানজিট যাত্রী | প্রায় ১০০,০০০ জন |
| এমিরেটসের সাপ্তাহিক অতিরিক্ত প্রিমিয়াম | প্রায় ১০০,০০০ মার্কিন ডলার (সমগ্র বহরের জন্য) |
| প্রতিদ্বন্দী বিমান সংস্থার প্রতি ফ্লাইটের প্রিমিয়াম | ৭০,০০০ থেকে ১৫০,০০০ মার্কিন ডলার |
| হামলা প্রতিহতের হার (দুবাই) | প্রায় ৩,০০০ ড্রোন ও মিসাইলের ৯৮% |
| প্রাথমিক অতিরিক্ত জ্বালানি বহন | সম্ভাব্য ডাইভারশনের জন্য অতিরিক্ত ৫ ঘণ্টা |



