পাবনায় নকল দুধ উৎপাদন: জেল-জরিমানাতেও থামছে না অসাধু চক্রের তৎপরতা

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং বারবার জেল-জরিমানা সত্ত্বেও থামছে না অস্বাস্থ্যকর ও নকল দুধ তৈরির অবৈধ কার্যক্রম। জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার মধ্যরাতে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে ফারুক হোসেন (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

অভিযানের বিস্তারিত ও দণ্ডপ্রাপ্তের বিবরণ

উপজেলার শিংগাড়ি জগন্নাথপুর গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেন দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও ক্ষতিকারক উপাদান মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করে আসছিলেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তিনি নিষিদ্ধ গ্লুকোজ জেলি, সয়াবিন তেল এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণে এই নকল তরল তৈরি করতেন।

শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় কারখানা থেকে দুধ তৈরির বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ সরঞ্জামসহ ২০০ লিটার গ্লুকোজ জেলি জব্দ করা হয়, যা পরবর্তীতে জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫০ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তকে এই দণ্ড প্রদান করা হয়।

অপরাধের পুনরাবৃত্তি ও স্থানীয় চিত্র

উল্লেখ্য যে, অভিযুক্ত ফারুক হোসেন এই একই অপরাধে এর আগেও সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। গত ২২ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন। তবে সেই দণ্ড ভোগ করার পরও তিনি পুনরায় একই অবৈধ ব্যবসায় লিপ্ত হন।

ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ফারুক হোসেন ছাড়াও আরও বেশ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী একই পদ্ধতিতে নকল দুধ উৎপাদন করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। চরভাঙ্গুড়া গ্রামের সঞ্জয় কুমার এবং কৈডাঙ্গা গ্রামের আবুল বাশারের নামও এই তালিকায় উঠে এসেছে। গত বছর আবুল বাশারকে অর্থদণ্ড দেওয়া হলেও তিনি পুনরায় গ্লুকোজ জেলি ও রাসায়নিক মিশিয়ে নকল দুধ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন।

নিচে ভাঙ্গুড়া উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য তুলে ধরা হলো:

অভিযুক্তের নাম এলাকা পূর্ববর্তী দণ্ড/অভিযোগ বর্তমান অভিযানের ফলাফল
ফারুক হোসেন শিংগাড়ি জগন্নাথপুর ৫০,০০০ টাকা জরিমানা (অক্টোবর ২০২৪) ১ বছর কারাদণ্ড ও ১ লক্ষ টাকা জরিমানা
সঞ্জয় কুমার চরভাঙ্গুড়া একাধিকবার জেল ও জরিমানা ভোগ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ
আবুল বাশার কৈডাঙ্গা গত বছর অর্থদণ্ড প্রাপ্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ

স্থানীয় খামারি ও সচেতন মহলের উদ্বেগ

ভাঙ্গুড়া বাজারের দুগ্ধ খামারি আমিরুল ইসলাম জানান, সাধারণ ও প্রকৃত খামারিরা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের দুধ চিলিং সেন্টারে পৌঁছে দেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক চিলিং সেন্টারে গভীর রাত পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ তরল বা দুধ আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক। স্থানীয়দের অভিযোগ, অসাধু চক্র এই নকল দুধ বিভিন্ন চিলিং সেন্টারের মাধ্যমে সারাদেশে সরবরাহ করছে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কারখানায় অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। বরং যেসব চিলিং সেন্টারে এই নকল দুধ গ্রহণ করা হচ্ছে, সেগুলোতেও প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। চিলিং সেন্টারের মালিকদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে নকল দুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মিজানুর রহমান এ প্রসঙ্গে জানান যে, জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এবং ভেজাল খাদ্য রোধে প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে। নকল দুধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি ব্যক্ত করেন। তবে প্রশাসনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে এবং অবৈধ কার্যক্রমের তথ্য দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।