বকেয়া যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার

কুড়িগ্রামের উলিপুরে বকেয়া ৪৫ হাজার টাকা যৌতুকের দাবিতে নাসরিন জাহান (২০) নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত স্বামী আলমগীর হোসেন (২৫) ও তাঁর মা পালিয়ে গেছেন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) পুলিশ ওই গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। নিহতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাতে উপজেলার ফকির মোহাম্মদ নামানির চর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার জন্য মরদেহ থানায় নেওয়া হয়।

নিহত নাসরিন জাহান উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের দোলন এলাকার বাসিন্দা নুর ইসলামের মেয়ে। প্রায় তিন বছর আগে পাশের ফকির মোহাম্মদ নামানির চর এলাকার লালু মিয়ার ছেলে আলমগীর হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে আড়াই বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

নিহতের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের টাকার জন্য নাসরিনকে প্রায়ই নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে অসন্তোষ ও দাম্পত্য কলহ চলছিল। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে কিছু টাকা দেওয়া হলেও বাকি অর্থ পরিশোধের জন্য চাপ অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছেন নাসরিনের পরিবারের সদস্যরা।

ঘটনার দিন রাতেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নাসরিনকে মারধর করা হলে তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, বকেয়া যৌতুকের ৪৫ হাজার টাকা দিতে না পারায় পরিকল্পিতভাবে তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিহতের বাবা নুর ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, মেয়ের বিয়ের সময় তাঁরা ২৫ হাজার টাকা যৌতুক দিয়েছিলেন। বাকি টাকা পরিশোধের জন্য সময় চাওয়া হয়েছিল। চলতি মৌসুমে ধান বিক্রি করে সেই অর্থ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই তাঁর মেয়েকে যৌতুকের বাকি টাকার জন্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আলমগীর হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই যৌতুকের জন্য নাসরিনকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত মেয়ের এমন মর্মান্তিক পরিণতি হবে, তা তাঁরা ভাবতে পারেননি।

ঘটনার পর থেকে আলমগীর হোসেন ও তাঁর মা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনেরা।

এ বিষয়ে উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে এসেছে। গৃহবধূর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শুক্রবার মর্গে পাঠানোর কথা রয়েছে।

ওসি জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনার পেছনে যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে যৌতুকের কারণে নারীর ওপর নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। বিয়ের সময় কিংবা পরবর্তী সময়ে অর্থ ও সম্পদের দাবিকে কেন্দ্র করে অনেক নারীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী যৌতুক দাবি, গ্রহণ ও প্রদান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একই সঙ্গে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের ফলে মৃত্যু ঘটলে প্রচলিত ফৌজদারি আইনেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নাসরিনের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারের অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের ভূমিকা স্পষ্ট হতে পারে। আড়াই বছরের শিশুসন্তানকে রেখে এক তরুণীর এমন মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।