বহু নির্বাচনের সাক্ষী নুরজাহান বেগম। জীবনের নানা উত্থান-পতনের মাঝেও ভোট দেওয়ার দিনটিকে তিনি সব সময় নাগরিক দায়িত্বের উৎসব হিসেবেই দেখেছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে পীরগাছা উপজেলার তেয়ানি মনিরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে এসে তাঁর সেই বিশ্বাসই মুহূর্তে চূর্ণ হয়ে যায়। বুথে ঢুকতেই পোলিং কর্মকর্তার কণ্ঠে শোনা যায় শীতল অথচ নির্মম বাক্য—“আপনার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে।”
কথাটি শুনে হতভম্ব হয়ে যান নুরজাহান বেগম। কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করেন, হয়তো ভুল হচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তার বক্তব্যে কোনো পরিবর্তন না আসায় তিনি বুথ থেকে বেরিয়ে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, “এত বছর থাকি ভোট দিয়া আসনু, কোনো সমস্যা হয় নাই। এবার বলে মোর ভোট আরেক জনে দিছে। মুই তো নিজেই দিবার আসনু।” তাঁর চোখের পানি যেন কেবল ব্যক্তিগত কষ্ট নয়—এটি ভোটাধিকার নিয়ে সাধারণ মানুষের গভীর অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি।
ঘটনার পর কেন্দ্রের ভেতর-বাইরে ছড়িয়ে পড়ে ফিসফাস, উৎকণ্ঠা আর ক্ষোভ। উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সকাল থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন, “আমরা সকাল থাকি দেখতেছি, কিছু ভোটার আসার আগেই নাকি তাদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। বিষয়টা খুবই উদ্বেগজনক।”
আরেক ভোটার রহিমা খাতুন ক্ষোভ ঝরিয়ে বলেন, “ভোট দিতে আইসা যদি শুনি ভোট হয়ে গেছে, তাহলে হামরা কই যামো? এটা তো হামার অধিকার।” তাঁদের কথায় স্পষ্ট, এমন ঘটনা শুধু একজন ভোটারের সঙ্গে অন্যায় নয়; এটি পুরো প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাকে নড়িয়ে দেয়।
কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মনছুর হোসেন অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “পোলিং এজেন্টদের অসতর্কতার কারণেই এমনটি ঘটতে পারে। সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি যেন এমনটা আর না হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”
এদিকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক জানান, “আমি ঘটনাটি খোঁজ নিয়ে দেখছি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রশাসনের এই বক্তব্যে সাময়িক আশ্বাস মিললেও ভোটারদের মনে তৈরি হওয়া সংশয় সহজে দূর হচ্ছে না।
ঘটনার পর কেন্দ্রটিতে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা দেখা দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তবে ভোটারদের দাবি—শুধু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নয়, ভোটাধিকার রক্ষায় কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত তদন্ত জরুরি। নুরজাহান বেগমের চোখের জল যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—নির্বাচনের সুষ্ঠুতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে গণতন্ত্রের শেকড়ও কেঁপে ওঠে।



