রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া শক্তিশালী পাইপ বোমাটি (আইইডি) মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব উল্টো রথযাত্রার শোভাযাত্রাকে লক্ষ্য করেই স্থাপন করা হয়েছিল। শুক্রবার রথযাত্রার বিশাল বহরটি যখন ওই এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন সেখানে আকস্মিক আতঙ্কের পরিবেশ কিংবা হুড়োহুড়ি থেকে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয় পুলিশ। উপস্থিত উৎসুক জনতা ও পুণ্যার্থীদের নিরাপদ দূরত্বে রাখতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে বৈদ্যুতিক ‘শর্ট সার্কিট’ হয়েছে বলে প্রচারণা চালায়।
পরবর্তীতে রথযাত্রার শোভাযাত্রাটি ওই এলাকা থেকে নিরাপদে পার হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমের দিকে চলে যাওয়ার পর পুলিশের বিশেষায়িত বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে শক্তিশালী বস্তুটি ধ্বংস করে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক উপাদান আইনে দায়ের করা একটি মামলায়। মামলার বাদী মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মুক্তা অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীদের আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রবল ধারণা, ধর্মীয় শোভাযাত্রায় নাশকতার মাধ্যমে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও প্রাণহানি ঘটানোই ছিল ঘাতকদের মূল উদ্দেশ্য। তবে সময়মতো বস্তুটি নজরে আসায় এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
মামলার বিবরণ ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) আয়োজিত উল্টো রথযাত্রার সুরক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দায়িত্বে ছিলেন এসআই মুক্তা। ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু হওয়া হাজার হাজার মানুষের রথযাত্রার পদযাত্রাটি মতিঝিল শাপলা চত্বর পার হয়ে স্বামীবাগের দিকে এগোচ্ছিল। সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুমে জরুরি বার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় জানানো হয়, মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর একটি বোমাসদৃশ জিনিস রয়েছে এবং সেখান থেকে লাল-সবুজ আলো জ্বলছে।
জরুরি খবর পাওয়া মাত্রই মতিঝিল থানা ও ডিএমপির অন্যান্য টিমের পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকাটি লাল ফিতা দিয়ে ঘিরে ফেলেন। ঠিক সেই জটিল মুহূর্তে রথযাত্রার অগ্রভাগ ওই পয়েন্টে চলে এলে সেখানে বড় ধরনের হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা কৌশল খাটান। শর্ট সার্কিটের কথা বলে মানুষকে দ্রুত সেখান থেকে সরে যেতে তাগিদ দেওয়া হয় এবং বিকল্প পথে রথযাত্রার শোভাযাত্রাকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
বিকেল ও সন্ধ্যার মধ্যকার এই সংকটময় পরিস্থিতি সামলে রথযাত্রার বহরটি নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে গেলে রাত ৮টার দিকে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের দক্ষ রোবোটিক বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সেখানে পৌঁছায়। তারা সুনির্দিষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে একটি বিশেষ কন্টেইনারে বোমাটির নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটায়।
বিস্ফোরণস্থলের আলামত পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা জানান, উদ্ধার করা ধাতব বস্তুটি ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং ক্ষতিকর স্প্লিন্টারে পূর্ণ। সেখান থেকে উদ্ধার করা আলামতের মধ্যে একটি জিআই পাইপের খণ্ড, শক্তিশালী ব্যাটারি, জটিল বিদ্যুতের সার্কিট বোর্ডের পাশাপাশি শত শত বিয়ারিং বল পাওয়া গেছে। মূলত বিস্ফোরণের সময় স্প্লিন্টারের গতি ও আঘাতের শক্তি বহুগুণ বাড়াতেই এসব বিয়ারিং বলের ব্যবহার করা হয়েছিল।
এদিকে, রাত ৮টার দিকে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের তীব্র স্প্লিন্টারে দুর্ঘটনাবশত বাইরে থাকা ৬৬ বছর বয়সী মিরাজ আহমেদ নামের এক পথচারী আহত হন। বিস্ফোরণের একটি টুকরো এসে সরাসরি তাঁর বাম চোখে আঘাত করে। ঘটনা ঘটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার করে তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুরো ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল এবং কাদের নির্দেশে এই পাইপ বোমাটি রথযাত্রার পথে ছাতার ভেতর রাখা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে সিটিটিসির একাধিক গোয়েন্দা টিম তদন্ত শুরু করেছে।



