দিদিয়ের দেশঁর প্রশিক্ষণে ফ্রান্স ফুটবল দল যেভাবে খেলছে, তাতে তাদের থামানো এখন যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই কঠিন। মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা আরও একবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখল। কোনো বড় অঘটন না ঘটলে ফরাসিরা আবারও ফাইনালের মঞ্চে উঠতে পারে। তবে শিরোপার সুবাস পাওয়ার আগে সেমিফাইনালে তাদের লড়তে হতে পারে স্পেনের মতো শক্তিশালী ও কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ফুটবল ইতিহাসে টানা তিনবার ফাইনালে খেলার কীর্তি রয়েছে কেবল পূর্বতন পশ্চিম জার্মানি এবং ব্রাজিলের। ১৯৯৪ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে ব্রাজিল টানা তিনবার ফাইনাল খেলে দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আর জার্মানি ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে টানা তিনবার ফাইনালে উঠে একবার ট্রফি জেতে। ফ্রান্স এখন সেই অভিজাত তালিকায় নাম লেখানোর পথেই হাঁটছে।
কৌতূহলজনক বিষয় হলো, কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও ফ্রান্স ও মরক্কো মুখোমুখি হয়েছিল এবং সেবারও ম্যাচের ফল ছিল ঠিক ২-০। তবে সেদিনের গোলদাতারা এবার শুরুর একাদশে ছিলেন না। লুকাস হার্নান্দেজ বসেছিলেন অতিরিক্ত খেলোয়াড়দের বেঞ্চে, আর রান্ডাল কোলো মুয়ানি তো দলেই জায়গা পাননি। কিন্তু ফরাসি শিবিরে যখন কিলিয়ান এমবাপের মতো তারকা থাকেন, তখন কোচের চিন্তার কারণ থাকে কম। মরক্কোর বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস করলেও শেষ পর্যন্ত দুর্দান্ত এক গোল ও অ্যাসিস্টে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিলেন এই ফরোয়ার্ডই।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিচ্ছিল, তবে ফ্রান্সের আক্রমণের ধার ছিল অনেক বেশি। খেলার মাত্র চার মিনিটের মাথায় দায়োত উপামেকানোর একটি জোরালো হেড চমৎকার দক্ষতায় রুখে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো। এরপর সময় যত গড়িয়েছে, ফরাসিদের আক্রমণের চাপ ততই বেড়েছে।
খেলার ২৫ মিনিটে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। নিজেদের অর্ধে মরক্কোর আশরাফ হাকিমির কাছ থেকে বল কেড়ে নেন ডেজিরে ডুয়ে। তিনি পাস বাড়ান এমবাপের দিকে। বল নিয়ে দ্রুত গতিতে মরক্কোর ডি-বক্সে ঢুকে পড়া এমবাপেকে ফাউল করেন নৌসের মাজরাউই। ফাউলটি এতটাই স্পষ্ট ছিল যে ডিফেন্ডার মাজরাউই নিজেও রেফারির সিদ্ধান্তের বিশেষ প্রতিবাদ জানাননি। তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে রেফারিরা তিন মিনিট দশ সেকেন্ড সময় নেন। এই দীর্ঘ অপেক্ষাই হয়তো এমবাপের মনোযোগ নষ্ট করে দিয়েছিল। ফলে তার নেওয়া দুর্বল শটটি অনায়াসে ধরে ফেলেন পেনাল্টি ঠেকাতে ওস্তাদ মরক্কোর কিপার বোনো। এর মিনিট দশেক পর ডুয়ের একটি দূরপাল্লার শটও প্রতিহত করেন বোনো। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে লুকাস ডিগনের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে লিড নেওয়া হয়নি ফ্রান্সের।
দ্বিতীয়ার্ধেও ফ্রান্স একই রকম আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলা শুরু করে। মরক্কো শুরুতে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও মাত্র চার মিনিটের ঝড়ে তাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ম্যাচের ডেডলক ভাঙেন এমবাপে নিজেই। মরক্কোর বক্সের বাইরে বল পেয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে ডান দিকে সামান্য কেটে চমৎকার এক শটে বল জালে জড়ান তিনি। ওড়ার সুযোগটুকুও পাননি বোনো।
প্রথম গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় গোলটি হজম করে মরক্কো। এবারও নেপথ্য কারিগর এমবাপে। নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণে মরক্কোর একাধিক ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে নেন তিনি, যার ফলে ফাঁকা জায়গায় চলে যান উসমান দেম্বেলে। এমবাপের পাস থেকে ডান পায়ের নিচু শটে গোল করতে ভুল করেননি দেম্বেলে। বোনো পজিশন ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে আসায় শটটি ঠেকানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
ফ্রান্স ম্যাচটি ২-০ ব্যবধানে জিতলেও মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনোর পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়। তিনি অন্তত পাঁচটি নিশ্চিত গোল না বাঁচালে মরক্কোকে আরও বড় পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হতো। ম্যাচজুড়ে মরক্কোর খেলোয়াড়রা ফাউল করে ফরাসিদের উত্তেজিত করার কিংবা খেলার গতি কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জয়রথ থামাতে পারেনি।



