মসজিদ কমিটি নিয়ে বিরোধ, মাদারীপুরে ঘরে আগুন ও লুটপাট

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের বাহেরান্দী এলাকায় মসজিদ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় প্রতিপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি বসতঘরে আগুন দেওয়া এবং প্রায় ৩০টি ঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বুধবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে বাহেরান্দী জামে মসজিদের পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে স্থানীয় বাসিন্দা মোশারফ ফকিরকে সভাপতি নির্বাচিত করা হলে আপত্তি জানান বাচ্চু মোড়ল। তিনি নিজেকে মসজিদ কমিটির সভাপতি হিসেবে দাবি করে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে বাচ্চু মোড়ল ও সাবেক ইউপি সদস্য এমদাদ মাতুব্বরের সমর্থকদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়ভাবে মসজিদ কমিটি নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ পরে দুই পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে রূপ নেয় বলে জানা গেছে। এর জেরে গত সোমবারও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সে সময় কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ।

সর্বশেষ বুধবার সকালে বিরোধের ধারাবাহিকতায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাচ্চু মোড়লের কর্মী-সমর্থকেরা শতাধিক লোক নিয়ে এমদাদ মাতুব্বরের সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালান। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচটি ঘরে আগুন দেওয়া হয় এবং প্রায় ৩০টি ঘর হামলার শিকার হয় বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা।

খবর পেয়ে মাদারীপুর সদর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে হামলার ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত, কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং কী পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তামিম মাতুব্বর পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, পুলিশ একটি পক্ষের হয়ে তাঁদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়। এরপর প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন।

তামিম মাতুব্বর বলেন, ‘পুলিশ তাদের (বাচ্চু) পক্ষ নিয়ে আমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়। এরপর বাচ্চু মোড়লের লোকজন আমাদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।’

তাঁর অভিযোগ, হামলার সময় তাঁরা নিজেদের বাড়িঘর ও সম্পদ রক্ষা করতে পারেননি। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা এবং লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের বিষয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাচ্চু মোড়ল। তাঁর দাবি, এলাকায় এমদাদ মাতুব্বর ও তাঁর সমর্থকেরাই আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁরা নিজেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে এখন তাঁর ওপর দায় চাপাচ্ছেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সাবেক ইউপি সদস্য এমদাদ মাতুব্বরও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাচ্চু মোড়লের লোকজন আজ যে তাণ্ডব চালাল, তারপরও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার দায় নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি উঠে এসেছে। ফলে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, হামলায় অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা এবং অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগে গত সোমবারও তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। তখন কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ দুই পক্ষকে একাধিকবার শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।

পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, দুই পক্ষই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পুলিশ কাজ না করলেই পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলা হয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের যে অভিযোগ উঠেছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এলাকায় উত্তেজনা, তদন্তের অপেক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার

একটি মসজিদের পরিচালনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে বসতঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন নিরাপত্তা ও সম্পদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

এ ধরনের বিরোধ যাতে পুনরায় সংঘর্ষে রূপ না নেয়, সে জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে এখন পর্যন্ত কারও গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র এবং দায়ীদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।