রাজধানীতে সক্রিয় ১২৭ কিশোর গ্যাং

রাজধানী ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নতুন করে উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন থানা এলাকায় অন্তত ১২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাং হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার থেকে শুরু করে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় শিশু হত্যা ও চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানায়, গত চার বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং–সম্পর্কিত অপরাধের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এই সময়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এম নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাং দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যাধি; তবে সম্প্রতি তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রতিটি থানাকে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ভার্চুয়াল সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবার প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, যেকোনো মূল্যে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার (সরকারি ও সংস্থাগত তথ্য)

বছর সারা দেশে সক্রিয় গ্যাং ঢাকায় সক্রিয় গ্যাং
২০২২ ১৭৩টি তথ্য অনির্দিষ্ট
২০২৪ ২৩৭টি ১২৭টি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি থানায় একাধিক কিশোর গ্যাং ছোট-বড় গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ‘বড় ভাই’ পরিচয়ে এসব গ্যাং পরিচালিত হয়। তারা ইভ টিজিং, ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এমনকি হত্যাকাণ্ডেও সম্পৃক্ত।

আদাবরে চাঁদাবাজি ও হামলা

সম্প্রতি রাজধানীর আদাবরে একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় চাঁদা না পেয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, ‘কালা রাসেল’ নামের এক গ্যাং নেতার নেতৃত্বে ১০-১২ জন সশস্ত্র কিশোর কারখানায় ঢুকে শ্রমিকদের কুপিয়ে আহত করে। ঘটনার প্রতিবাদে দেড় শতাধিক শ্রমিক ও মালিক আদাবর থানা ঘেরাও করেন। পুলিশ মূল অভিযুক্তসহ পাঁচজনকে আটক করেছে এবং জানায়, হামলাকারীরা আগে থেকেই কারখানাটির ওপর নজরদারি করছিল। ওই এলাকায় আরও অন্তত সাতটি গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য মিলেছে।

যাত্রাবাড়ীতে শিক্ষার্থী হত্যা

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী এলাকায় ১৫ বছর বয়সী এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে ছুরি মেরে হত্যার অভিযোগ উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। প্রাথমিক তদন্তে স্থানীয় একটি গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সামাজিক কারণ ও প্রতিরোধ উদ্যোগ

এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ কিশোর অপরাধী দারিদ্র্যজনিত কারণে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফির প্রভাব ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিও কিশোরদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ৫৫০টি সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সামাজিক সচেতনতা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।