রিজার্ভ চুরির প্রতিবেদন পিছিয়ে গেল ৯৭তম বার

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা আবারও পিছিয়েছে। এবারও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ফলে মামলাটির প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯৭ বারের মতো পিছিয়ে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করেছেন আদালত।

রোববার (৯ আগস্ট) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহর আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে নির্ধারিত দিনে তদন্ত সংস্থা সিআইডি প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান।

যেভাবে চুরি হয়েছিল রিজার্ভের অর্থ

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। সুইফট বার্তার মাধ্যমে একাধিক অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ পাঠিয়ে মোট ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে ওই অর্থের বড় অংশ ফিলিপাইনে স্থানান্তরিত হয়।

ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এবং সুইফট ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, দেশের ভেতরের একটি চক্রের সহায়তা ছাড়া এত বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব ছিল না। তবে মামলার শুরুতে সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে আসামি করা হয়নি।

ঘটনার প্রায় এক মাস পর, ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা। অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে করা ওই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।

ফিলিপাইনে অর্থের গন্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি হওয়া অর্থের বড় অংশ ফিলিপাইনের স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তর করে তিনটি ক্যাসিনোতে প্রবেশ করে। সেখান থেকে অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলার ফিলিপাইনের একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরে ফিলিপাইন সরকার ওই অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত দেয়। তবে বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

এই বিপুল অর্থের গতিপথ শনাক্ত করা এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে। অর্থ কোথা থেকে নির্দেশিত হয়েছিল, কারা অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করেছিল এবং ফিলিপাইনে পৌঁছানোর পর কীভাবে অর্থের মালিকানা বদলেছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।

নিউইয়র্কে আইনি লড়াই

রিজার্ভ চুরির ঘটনার তিন বছর পর, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা করে। মামলায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

তবে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন মামলাটি খারিজের আবেদন করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালের এপ্রিলে নিউইয়র্কের আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলাটি খারিজ করে দেয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, মামলাটি বিচার করার জন্য ওই আদালতের পর্যাপ্ত এখতিয়ার নেই।

এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অর্থ উদ্ধারের আইনি প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে নিউইয়র্কের এখতিয়ারভুক্ত অন্য আদালতে মামলা করা হয়েছে।

৯৭ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন

মামলাটির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে দীর্ঘসূত্রতা। সিআইডি একাধিকবার আদালতের কাছ থেকে সময় নিয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় বারবার নতুন তারিখ নির্ধারণ করতে হয়েছে।

রোববারও সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। ফলে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর আবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে। অর্থাৎ, রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এ নিয়ে ৯৭ বার পেছাল।

প্রায় এক দশক আগে ঘটে যাওয়া এই আর্থিক অপরাধের ঘটনায় এখনো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল না হওয়ায় মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন রয়েছে। চুরি যাওয়া অর্থের বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর সিআইডি প্রতিবেদন দিতে পারে কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।