রিমেকের জনপ্রিয়তা: নস্টালজিয়া নাকি সৃজনশীলতার সংকট?

পুরোনো গানের সুর, কথা ও আবেগকে নতুন সংগীতায়োজন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ভিন্ন কণ্ঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের সামনে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ইউটিউব, ফেসবুক, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর বিস্তারের কারণে কয়েক দশক আগের গানও খুব সহজে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। পরিচিত সুর শুনে একদিকে যেমন পুরোনো শ্রোতাদের মনে জেগে উঠছে স্মৃতি, অন্যদিকে তরুণ শ্রোতারাও অনেক পুরোনো গান নতুন করে আবিষ্কার করছেন।

কিন্তু এই প্রবণতাকে কীভাবে দেখা হবে—নস্টালজিয়ার স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে, নাকি নতুন সৃষ্টির ঘাটতির লক্ষণ হিসেবে? প্রশ্নটি এখন বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দেশে রিমেক গানের চর্চা অবশ্য নতুন নয়। ক্যাসেট ও সিডির যুগেও পুরোনো সিনেমার জনপ্রিয় গান নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশ করা হতো। নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত মিশ্র রিমেক অ্যালবামে পুরোনো গানের সঙ্গে সমকালীন পপধারা, সিন্থেসাইজার ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সংযোজন দেখা যেত। তখন রিমেকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পরিচিত গানকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতার উপযোগী করে তোলা। ডিজিটাল যুগে সেই একই প্রবণতা নতুন গতি পেয়েছে।

বাংলাদেশে এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘চুমকি চলেছে একা পথে’। ‘দোস্ত দুশমন’ চলচ্চিত্রে খুরশীদ আলমের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া গানটি পরবর্তী সময়ে পান্থ কানাই নতুন সংগীতায়োজনে পরিবেশন করেন। শ্রোতাদের সাড়া পাওয়ার ধারাবাহিকতায় চলতি বছর তিনি ‘আবার চুমকি’ নামে গানটির সিক্যুয়ালধর্মী উপস্থাপনাও করেছেন। নতুন ভিডিওতে ষাট ও সত্তরের দশকের চলচ্চিত্রের আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল। ফলে এখানে শুধু গানটির পুনঃপরিবেশন নয়, পুরোনো সময়ের দৃশ্যভাষাকেও নতুন প্রজন্মের সামনে হাজির করা হয়েছে।

একইভাবে ইমরান মাহমুদুল বেশ কিছু পরিচিত চলচ্চিত্রের গান নতুন সংগীতায়োজন ও কণ্ঠে প্রকাশ করেছেন। ‘তুমি আমার জীবন’, ‘হৃদয়ের আয়না’, ‘তুমি চাঁদের জোছনা নও’, ‘আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা’, ‘অনেক সাধনার পরে’ এবং ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি’—এ ধরনের গান নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে আবার পৌঁছেছে তাঁর পরিবেশনায়। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ‘অনুতপ্ত’ চলচ্চিত্রে কুমার শানুর কণ্ঠে গাওয়া ‘আমার মনের আকাশে আজ’ গানটির নতুন সংস্করণ। ইমরান নিজেই গানটি গেয়েছেন এবং সংগীতায়োজন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গানটি শুনে বড় হয়েছেন বলেই মূল কথা ও সুর অক্ষুণ্ন রেখে নিজের সংগীতভাবনায় সেটিকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছেন।

লোকসংগীতেও রিমেক ও ফিউশনের প্রভাব দীর্ঘদিনের। হাবিব ওয়াহিদের ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবাম এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০০৩ সালে প্রকাশিত অ্যালবামটি রিমিক্স ও ফিউশনধর্মী সংগীতকে মূলধারার শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি দেয়। অ্যালবামের ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’ গানের মূল রচয়িতা ও সুরকার ছিলেন সিলেটের মরমী গীতিকবি ও সুফি সাধক আরকুম শাহ। হাবিব ওয়াহিদ গানটির আধুনিক সংগীতায়োজন করেন এবং কণ্ঠ দেন কায়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে লোকগানের পুনঃপরিবেশন আরও দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। সিলেট অঞ্চলের বিয়ের গান ‘আইলো রে নয়া দামান’ মুজা ও তোসিবার কণ্ঠে নতুনভাবে প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া ফেলে। ২০২১ সালে গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গানটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অসংখ্য নাচ ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও। তবে গানটির মূল রচয়িতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে এবং পুরোনো বেতার রেকর্ডে শিল্পী ও রচয়িতার পরিচয় নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। এই ঘটনা দেখায়, লোকগান পুনঃপরিবেশনের ক্ষেত্রে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, উৎস ও স্রষ্টার পরিচয় সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

চলচ্চিত্রের গানও একইভাবে নতুন করে শ্রোতাদের কাছে ফিরছে। ‘বুক চিন চিন করছে’ গানটি ‘শিল্পী’ নাটকের নতুন সংস্করণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আবার পরিচিতি পায়। মূল গানটি ‘বাস্তব’ চলচ্চিত্রে এন্ড্রু কিশোর ও ডলি সায়ন্তনীর কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছিল। নতুন সংস্করণে কণ্ঠ দেন জাহেদ পারভেজ পাভেল এবং সংগীত পুনর্বিন্যাস করেন আভ্রাল সাহির। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গানটির ভিডিও বিপুলসংখ্যক দর্শক পেয়েছে, যা পরিচিত গানের নতুন সংস্করণের সম্ভাব্য বাজারকে স্পষ্ট করে।

তবে সব রিমেকের উদ্দেশ্য যে বাজার দখল করা, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে মূল শিল্পীরাই নিজেদের পুরোনো গান নতুন করে প্রকাশ করছেন। কুমার বিশ্বজিৎ একসময় নিজের গাওয়া ৪৮টি পুরোনো গান নতুনভাবে প্রকাশের জন্য বাছাই করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ভালো অনেক গান প্রকাশের সময় প্রত্যাশিত সংখ্যক শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। নতুন সংগীতায়োজন ও আধুনিক পরিবেশনার মাধ্যমে সেসব গান আবার শ্রোতাদের সামনে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে সংগীত সংরক্ষণের বিষয়টিও জড়িত। সময়ের সঙ্গে পুরোনো রেকর্ডিংয়ের শব্দমান, পরিবেশনা ও বাদ্যযন্ত্রের ধরন অনেক সময় বর্তমান শ্রোতার অভ্যাসের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। নতুন করে রেকর্ড করলে গানটি আরও সহজে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ ও পরিবেশন করা যায়। তবে সেখানে মূল সুর, কথা এবং গানের স্বাতন্ত্র্য কতটা রক্ষা করা হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

রিমেকের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—রিমেক আর নকল এক নয়। একটি পুরোনো গানকে নতুন সংগীতায়োজনে পরিবেশন করতে হলে মূল স্রষ্টার কাজের প্রতি সম্মান, যথাযথ অনুমতি এবং সৃষ্টিশীল পুনর্বিন্যাস জরুরি। নকীব খানের সুর করা রেনেসাঁর ‘হৃদয় কাদা মাটির কোনো মূর্তি নয়’ গানটি তরুণ শিল্পীদের কণ্ঠে নতুনভাবে পরিবেশনের ক্ষেত্রে মূল স্রষ্টার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। আবার ২০২৬ সালে রেনেসাঁর ‘আজ যে শিশু’ নতুন করে পরিবেশন করেছেন নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া ও বাপ্পা মজুমদার। বাপ্পা মজুমদারের বক্তব্য ছিল, কিছু গানের আবেদন সময় পেরিয়েও অটুট থাকে; নতুনভাবে পরিবেশনের উদ্দেশ্য সেই আবেদন নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।

এই জায়গাতেই রিমেকের সাফল্য ও ব্যর্থতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়। একটি সফল রিমেক শুধু পুরোনো গানকে আবার বাজায় না; বরং তার আবেগকে অক্ষুণ্ন রেখে নতুন সংগীতভাষা তৈরি করে। নতুন বাদ্যযন্ত্র, কণ্ঠ, তাল, শব্দ বিন্যাস কিংবা দৃশ্যায়নের মাধ্যমে গানটি আলাদা একটি পরিচয় পেতে পারে। বিপরীতে শুধু পরিচিত নাম, পুরোনো সুর এবং জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে কোনো গান পুনরায় প্রকাশ করলে সেটি সহজেই সৃষ্টিশীলতার শর্টকাটে পরিণত হতে পারে।

সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর মন্তব্যের মধ্যেও এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। তাঁর মতে, নস্টালজিয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; বিনোদন শিল্পে এটি একটি বিপণনযোগ্য সম্পদও হয়ে উঠেছে। পরিচিত গান মানুষকে দ্রুত আকৃষ্ট করে। নতুন গানকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে যেখানে সময়, প্রচারণা ও পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, সেখানে পুরোনো জনপ্রিয় গান তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে তাৎক্ষণিক আগ্রহ তৈরি করতে পারে।

কণ্ঠশিল্পী ধ্রুব গুহ অবশ্য রিমেককে গানের সংরক্ষণের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও দেখেছেন। তবে তাঁর সতর্কতার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ—রিমেক করতে গিয়ে মূল শিল্পীর স্বকীয়তা বা গানের মান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ একটি জনপ্রিয় গান শুধু তার কথা ও সুরের জন্য জনপ্রিয় হয় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নির্দিষ্ট সময়, শিল্পীর কণ্ঠ, পরিবেশনা এবং শ্রোতার ব্যক্তিগত স্মৃতি।

সুতরাং রিমেকের জনপ্রিয়তাকে এক কথায় সৃজনশীলতার সংকট বলা যায় না। আবার প্রতিটি রিমেককে নতুনত্বের উদাহরণ বলাও ঠিক হবে না। এর মধ্যে যেমন রয়েছে অতীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক চেষ্টা, তেমনি রয়েছে পরিচিত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে দ্রুত শ্রোতা পাওয়ার বাণিজ্যিক কৌশল।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এখানেই। পুরোনো গান নতুন করে গাওয়ার পাশাপাশি এমন নতুন গান তৈরি করা জরুরি, যেগুলো আজকের সময়ে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলবে। কারণ আজকের শ্রোতার কাছে যদি নতুন গান কম পৌঁছায়, তাহলে আগামী প্রজন্মের হাতে ভবিষ্যতে রিমেক করার মতো নতুন ঐতিহ্যই বা থাকবে কোথায়?

শেষ পর্যন্ত ভালো রিমেক অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে। দুর্বল রিমেক শুধু অতীতের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের সংগীতের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করবে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কতটা সৃষ্টিশীলভাবে তৈরি করা যায় তার ওপর।

Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।