মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্য প্রায়ই ১/২ ঘন্টার নোটিশে ভার্সিটি বন্ধ ঘোষনার ফলে আমাদের শিক্ষা জীবন প্রলম্বিত হয়েছিল অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার জন্য চার বছরের পরিবর্তে প্রায় ৭ বছরে। কিছুদিন পরপর হঠাৎ করে আকস্মিকভাবে ঘোষিত এই ছুটিগুলো সে সময় পরিচিতি লাভ করেছিল ‘এরশাদ ভ্যাকেশন’ নামে। কিন্তু এজন্য আমাদের তেমন দুঃখবোধ ছিলো না। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সে সময়ে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক অসাধারণ পাদপীঠে পরিণত হয়েছিল। তবে একইসাথে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সখ্যতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে তীব্র সংঘাত, গোলাগুলি এমনকি অনেকগুলো হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল। এছাড়া অপরাপর ছাত্র সংগঠন যেমন ছাত্রদল বনাম আওয়ামী ছাত্রলীগ, আওয়ামী ছাত্রলীগ বনাম জাসদ ছাত্রলীগ, আবার কখনো কখনো জাসদ ছাত্রলীগের সাথে জাতিয়তাবাদি ছাত্রদলের মধ্যেও বেশকিছু বড় রকমের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা সে সময়ের ছাত্রছাত্রীদের অজানা নয়।
সেসময়ে বিখ্যাত কোন ক্যাডারের অন্যতম সঙ্গী হয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্রসহ ক্যাম্পাসে সারাক্ষণ ঘুরেবেড়ানো ও পেশী শক্তির শোডাউন করা, নিজ গ্রুপের শক্তি বৃদ্ধির জন্য বহিরাগত অছাত্র মাস্তানদেরকে আবাসিক হলে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে ভার্সিটিতে পড়তে আসা অনেক নিরিহ শিক্ষার্থীদেরকে নিজ কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে অস্ত্রধারী ক্যাডার ও বহিরাগতদের দিয়ে রুম ও হলের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা, হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিনে এসব ক্যাডারদের দলবেঁধে দিনের পর দিন বিনে টাকায় ম্যানেজারকে খাবার সরবরাহে বাধ্য করা, নীলক্ষেত ও এলিফ্যান্ট রোড সহ গুলিস্তানের বিভিন্ন শো-রুম, দোকান ও প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি করা, এমনকি হলের নিরিহ আবাসিক ছাত্রদেরকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মাসিক খরচের জন্য তাদের পিতামাতা কতৃক প্রদত্ত কষ্টার্জিত টাকা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটতে দেখেছি! ভয়ে কিংবা অন্য কোন কারণে আজ অবধি এসব নিয়ে কেউ কখনো কথা বলেনি।
ছাত্র নেতাদের মধ্যে ক্যাডার পরিচয়ের পাশাপাশি এমনকিছু বিকৃত অভিরুচি সম্পন্ন বড় ভাই, সহপাঠী ও ছোট ভাইদেরকে দেখেছি যাদের নেশাই ছিলো নিয়মিতভাবে নারী শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত করা, এমনকি জোরপূর্বক যৌনলালসা পূরণ করা। এদের কারো কারো দ্বারা বিবাহিত নারী শিক্ষার্থীদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ক্যাম্পাসে বহুল চর্চিত বিষয়। এদের অনেকের রুমেই রাত হলে জমে উঠতো মদের ও জুয়াখেলার জমজমাট আসর!
স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর অনেকগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে, আবার বিদায় নিতেও বাধ্য হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি শাসনামলেই উল্লেখিত চরিত্রের ছাত্র নেতাদের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। খাঁটি, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের চেয়ে এরাই যেন সবসময় দাপট দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে। এদের অনেকেই এমপি হয়েছে, মন্ত্রীত্ব বা অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবী পাওয়ার দৌড়েও এদেরকেই সন্মুখসারিতে দেখা গেছে। আবার টিভি চ্যানেলগুলোর সম্প্রসারণের এই যুগে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সুবিধাবাদি একটি গোষ্ঠী সুযোগ বুঝে সরকারকে তৈলমর্দন করে ও চাপাবাজির জোরেও কেউ কেউ জায়গা করে নিতে সমর্থ হয়েছে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী জাতীয় বিভিন্ন পজিশনে, কিংবা সরকারের উচ্চপদস্থ চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন নিয়োগগুলোতে।
বিগত শেখ হাসিনার জোর করে থাকা শাসনামলের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা কীভাবে শেষ পর্যন্ত ফুঁসে উঠেছিল কারো অজানা নয়। এই অভ্যুত্থান পরবর্তী নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ এর আগষ্ট থেকে ২০২৬ এর মধ্য ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তার পরিষদবর্গকে সঙ্গে নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়ার পর জনগণ অপেক্ষায় ছিলো দীর্ঘকাল পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার দেশ ও জাতির জন্য কি করে। কিন্তু জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনের আগেই দলটির অসংখ্য ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদেরকে বাদ দিয়ে এমন অনেকে এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন যাদের মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঋণখেলাপী ব্যবসায়ী, যুগের অনপোযোগী বয়োজ্যেষ্ঠ অসুস্থ নেতৃবৃন্দ, আর একঝাঁক নতুন মুখ যাদের কারো কারো বিরুদ্ধে ছাত্রাবস্থা থেকেই ইতিপূর্বে উল্লেখিত নানা ধরনের নীতি বহির্ভূত ও অনৈতিক কাজের সংশ্লিষ্টতার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এই শ্রেণীভূক্তদের কেউ কেউ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরু দায়িত্ব পাওয়ায় সঙ্গত কারণেই জনমনে নানা সংশয় দেখা দিয়েছে।
এ সময়ে বাংলাদেশের সকল কাজের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে গেলে মনে হবে এ যেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এক বিশাল হাট—যেখানে পদ-পদবীর মান উন্নয়ন, পদোন্নতি, এ সরকারের অনুগত হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে চাকুরি সমুন্নত রাখা, বদলি, আর টেন্ডার বাণিজ্যের এক মহা মিলনমেলায় মুখরিত একটি স্থান। সচিবালয়ের অফিসগুলোর ভেতরে ও বাইরে নানা শ্রেণী ও পেশার মানুষ গিজগিজ করছে। একই অবস্থা মন্ত্রী বা এমপিদের নিবাস স্থলগুলোতেও। বাস্তবে কি হচ্ছে বা না হচ্ছে তা যাদের জানার কথা তারা ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু জনশ্রুতি আছে যে, দূর্নীতির প্রকোপ দিনদিন বেড়েই চলেছে। সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও অধিদপ্তরের অফিসগুলোতে বহিরাগতদের অত্যাধিক ভিড় কি বার্তা বহন করে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা অবান্তর কিছু নয়।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের কাছে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং চাঁদাবাজি দূর করায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করা। তাছাড়া, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষা হলো আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার, এবং বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সাথে সাথে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রতি সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে—জনগণ এমন একটি পরিবেশ দেখতে চায় যেখানে তারা নিরাপদে ও সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারবে এবং সরকারের কাজের সরাসরি সুফল ভোগ করতে পারবে।
তা না হলে আবারও যদি দেশের গতিপ্রকৃতি পূর্বের গতানুগতিক ধারায় নানারকম অরাজকতাকে ধারণ করে চলতে থাকে, তার পরিণতি কারো জন্যই স্বস্তিদায়ক হবেনা। শুধু বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্র গুলো থেকেও এ নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে।
মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গবেষক।