সাংবাদিকতা থেকে পর্নোজগৎ, এবার কলম্বিয়ার সিনেটর

কলম্বিয়ার রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন দেইসি আলেজান্দ্রা ওমানা অর্টিজ। ৩৩ বছর বয়সী এই বামপন্থী রাজনীতিকের পেশাজীবনের পথচলা অন্য অনেক আইনপ্রণেতার চেয়ে একেবারেই আলাদা। সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে প্রবেশ, সেখান থেকে রাজনীতিতে আসা এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে জায়গা করে নেওয়া—দেইসির জীবনের এই বাঁকবদল এখন কলম্বিয়া ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় স্থানীয় সময় গত সোমবার বামপন্থী রাজনৈতিক দল হিস্টোরিক প্যাক্ট ফর কলম্বিয়ার হয়ে সিনেটর হিসেবে শপথ নেন দেইসি। এর আগে গত মার্চে দেশটির নর্তে দে সান্তান্দার অঞ্চল থেকে তিনি সিনেটর নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর থেকেই তাঁর অতীত পেশাজীবন, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সামাজিক অধিকার নিয়ে তাঁর বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

দেইসির রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের আগে ছিল সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা। ২০১৭ সালে তিনি সেই পেশা ছেড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে যোগ দেন। সেখানে ‘আমারান্তা হাঙ্ক’ নামে পরিচিতি পান এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে সেই জগতের পেশাজীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রায় দুই বছরের মাথায় তিনি ক্যামেরার সামনে থেকে সরে এসে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর ধীরে ধীরে নিজেকে একজন পূর্ণকালীন রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেইসির মতে, এই খাতে কাজ করা মানুষের অনেকেই বিভিন্ন ধরনের শোষণ, বৈষম্য এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের মুখোমুখি হন। বিশেষ করে কোম্পানি ও এজেন্সির মাধ্যমে শোষণের ঝুঁকি থেকে তাঁদের সুরক্ষা দিতে কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন।

সিনেট নির্বাচনের প্রচারণার সময় দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় দেইসি অভিযোগ করেন, ভুয়া তথ্য, কুসংস্কার এবং সামাজিক দ্বিচারিতার কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত নারীরা দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর দাবি, এই শিল্পকে নীতিমালার আওতায় এনে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।

তাঁর প্রার্থিতা অবশ্য সমালোচনার মুখেও পড়েছিল। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেছিল, অতীতে পর্নোশিল্পে কাজ করা কোনো ব্যক্তির নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া উচিত নয়। কিন্তু দেইসি সেই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর পাল্টা যুক্তি ছিল, প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করেছেন এমন নারীরা কেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারবেন না?

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ইতালির সাবেক আইনপ্রণেতা ইলোনা স্টালারের উদাহরণও টেনেছেন। স্টালার, যিনি ‘সিকিওলিনা’ নামে পরিচিত ছিলেন, একসময় প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করেছেন এবং পরে ইতালির পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। দেইসির বক্তব্যে এই উদাহরণটি ছিল মূলত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অতীত পেশার ভিত্তিতে বৈষম্য না করার পক্ষে একটি যুক্তি।

দেইসি মনে করেন, তাঁর আগের পেশাগত অভিজ্ঞতা রাজনীতিতে তাঁর জন্য একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। বৈষম্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা তাঁকে এসব বিষয়ে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এখন সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পার্লামেন্টে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নতুন এই সিনেটর।

তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে সমাজের একটি বৈপরীত্যও। দেইসির ভাষায়, সমাজ প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পের বিষয়বস্তু গ্রহণ করে, কিন্তু সেই শিল্পে কাজ করা মানুষদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব মেনে নিতে অনীহা দেখায়। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার অন্যতম লক্ষ্য হলো এই দ্বৈত মানসিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট মানুষদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা তৈরি করা।

তবে দেইসির রাজনৈতিক এজেন্ডা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পের কর্মীদের অধিকারেই সীমাবদ্ধ নয়। বামপন্থী এই সিনেটর মানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতেও তিনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

দেইসির সিনেটর নির্বাচিত হওয়া তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ব্যতিক্রমী পেশাগত পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি কলম্বিয়ার রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অতীত পেশার ভিত্তিতে মানুষের মূল্যায়ন নিয়ে নতুন বিতর্কও তৈরি করেছে। সাংবাদিকতা থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্প, আর সেখান থেকে জাতীয় রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো দেইসির যাত্রা দেখাচ্ছে—রাজনীতিতে প্রবেশের পথ অনেক সময় প্রচলিত ধারণার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। এখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যক্তিগত পরিচিতি ও অতীতকে ঘিরে বিতর্ক পেরিয়ে একজন আইনপ্রণেতা হিসেবে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।