শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি
কিছু গান কেবল গান নয়—একেকটি গান হয়ে ওঠে ইতিহাসের দলিল, সময়ের সাক্ষী, মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের অনির্বাণ শিখা। কিছু কণ্ঠ কেবল সুর বহন করে না—বহন করে একটি জাতির আকাঙ্ক্ষা, বেদনা, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং মুক্তির আকুলতা।
অংশুমান রায়ের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ তেমনই এক কালজয়ী গান। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে এই গান যেন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের সঙ্গে কোটি বাঙালির কণ্ঠকে একসূত্রে বেঁধেছিল। আজও গানটি শুনলে ফিরে আসে সেই উত্তাল সময়—মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের অগ্নিগর্ভ ইতিহাস।
জন্ম ও সংগীতসাধনা
প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী অংশুমান রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯ আগস্ট ১৯৩৬ সালে, পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবায়। লোকসংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং অসাধারণ কণ্ঠসাধনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা গানের জগতে স্বতন্ত্র আসন করে নেন।
তিনি প্রথম জীবনে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং লোকসংগীতকে মানুষের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে চাকরির নিরাপদ জীবন ছেড়ে সংগীতের অনিশ্চিত অথচ সৃষ্টিশীল পথে নিয়ে যায়। এরপর সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সাধনা, কর্ম ও আত্মপরিচয়ের প্রধান অবলম্বন।
প্রায় তিন দশকের সংগীতজীবনে তিনি লোকগান, আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রের গানসহ নানা ধারায় কণ্ঠ দিয়েছেন। ‘ভাদ্র আশ্বিন মাসে ভ্রমর লাগে কাঁচা বাঁশে’, ‘দাদা পায়ে পড়ি রে, মেলা থেকে বউ এনে দে’-সহ তাঁর বহু গান দুই বাংলার শ্রোতাদের হৃদয়ে আজও অমলিন।
যে গান ইতিহাস হয়ে উঠেছিল
তবে অংশুমান রায়ের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে একটি গানের সূত্রে—
«‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে
লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি
আকাশে বাতাসে ওঠে রণি-
বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’»
গানটির কথা লিখেছিলেন প্রখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার এবং সুরারোপ ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন অংশুমান রায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় এক চায়ের আড্ডায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে কেন্দ্র করে গানটির জন্ম। আকাশবাণী কলকাতার ‘সংবাদ-বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে গানটি প্রচারিত হওয়ার পর তা দ্রুত মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
গানটির জন্মের পেছনের গল্পটিও যেন একাত্তরের ইতিহাসেরই অংশ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের পরিকল্পনার সময় ভাষণটি তুলনামূলক ছোট হওয়ায় তার সঙ্গে একটি গান যুক্ত করার চিন্তা আসে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তখন গানটির কথা লিখে দেন, আর অংশুমান রায় তাতে সুর বসিয়ে নিজের কণ্ঠে গানটি তুলে নেন।
এরপর গানটি শুধু একটি গান থাকেনি—হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত বাঙালির এক অনন্য সাংস্কৃতিক অস্ত্র।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে প্রেরণার সুর
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে গানটি সীমান্তের এপার-ওপার ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের সঙ্গে অংশুমান রায়ের কণ্ঠ যেন একই সুরে উচ্চারণ করেছিল একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
মুক্তিযুদ্ধের গানগুলোর মধ্যে এই গানটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও গানটির পরিবেশন শোনা যায়; মোহাম্মদ আবদুল জব্বারও গানটি কণ্ঠে ধারণ করেন। ফলে গানটি মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আরও গভীরভাবে স্থান করে নেয়।
এ গান শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হতো, তা কেবল সুরের আবেগ ছিল না—এর মধ্যে ছিল স্বদেশ ফিরে পাওয়ার প্রত্যয়, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি মুক্ত বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা।
বাংলাদেশের প্রতি এক অকৃত্রিম ভালোবাসা
অংশুমান রায়ের বাংলাদেশের প্রতি টান ছিল গভীর ও আন্তরিক। তাঁর পূর্বপুরুষদের শিকড় ছিল রাজশাহীতে—এই পারিবারিক শিকড়ও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর আবেগকে আরও নিবিড় করেছিল বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গানের জন্য অংশুমান রায় ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেই সম্মাননা আর প্রদান করা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে ২০১২ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ সরকার অংশুমান রায়কে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। ঢাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর পুত্র, বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ভাস্কর রায়।
এক শিল্পী, এক গান, এক ইতিহাস
অংশুমান রায় আজ আমাদের মাঝে নেই। ২২ এপ্রিল ১৯৯০ সালে তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হয়, শিল্পের নয়; কণ্ঠ স্তব্ধ হয়, ইতিহাসের প্রতিধ্বনি স্তব্ধ হয় না।
আজও যখন ভেসে আসে—
‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে
লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি…’
তখন মনে হয়, একাত্তর যেন আবার ফিরে এসেছে। মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠের সঙ্গে মিশে গেছে লক্ষ-কোটি মানুষের কণ্ঠ। মনে হয়, একটি মানুষের উচ্চারণ কীভাবে একটি জাতির সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে—অংশুমান রায়ের গান তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তিনি ছিলেন ভারতের শিল্পী, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে যে বাংলাদেশ কথা বলেছিল, সেই বাংলাদেশ তাঁকে কখনো পর মনে করেনি। তিনি ছিলেন দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের এক উজ্জ্বল নাম; আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন অকৃত্রিম সুহৃদ, সংগীতসাধক ও মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক হিসেবে।
১৯ আগস্ট—তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই কালজয়ী শিল্পীকে।
আপনার কণ্ঠ থেমে গেছে বহু বছর আগে,
কিন্তু থামেনি আপনার গানের প্রতিধ্বনি।
একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে যে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বর জেগে উঠেছিল—
সেই প্রতিধ্বনি আজও আকাশে-বাতাসে বাজে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, অংশুমান রায়।
আপনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গান হয়ে,
বাংলার মানুষের হৃদয়ে—চিরকাল।

