মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: 26শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ১০ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
একজন মনীষী বলেছিলেন, ‘যে দেশ জ্ঞানীর কদর করতে জানে না, সে দেশে জ্ঞানী জন্মায় না।’ আমাদের দেশে জ্ঞানী গুণীজন জন্মায় কিন্তু আমরা তাঁর কদর করতে জানি না। তাঁর কদর হয় ভিন্ন স্থানে ভিন্ন দেশে। আমরা নিজেরাই তাদের অন্যত্রে পাঠিয়ে দেয়ার যাগযজ্ঞের আয়োজন করে থাকি। তেমনি অবহেলিত বিশ্ববরেণ্য শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতান।
এস. এম. সুলতান ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্টে যশোরের নড়াইলের মাছিমদিয়া নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ মোহাম্মদ মেছের আলী। শৈশবে পরিবারের সবাই সুলতান কে লাল মিয়া বলে ডাকতো।
১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর পরেই বেরিয়ে পড়েন নিরুদ্দেশ ঠিকানায়। উপমহাদেশের পথে পথে ঘুরে তাঁর অনেকটা সময় কেটে যায়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। অনেক মার্কিন ও ব্রিটিশ সৈন্য তখন ভারতে ছিল। তিনি ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে ছবি এঁকে তা সৈন্যদের কাছে বিক্রি করতেন। এভাবেই তিনি সেসময় জীবনধারণ করেছেন। মাঝে মাঝে তাঁর ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি শিল্পী হিসেবে কিছুটা পরিচিতি লাভ করেন।
এরপর তিনি লন্ডনেও ছবি প্রদর্শনী করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে আবার নড়াইলে ফিরে আসেন। এবার এসে তিনি শিশু শিক্ষার প্রসারে কাজ শুরু করেন যা নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল। শেষ বয়সে তিনি নড়াইলে ‘শিশুস্বর্গ’ এবং ‘চারুপীঠ’ নামের দুটি শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। এছাড়া সেখানে ‘নন্দন কানন’ নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ‘নন্দন কানন স্কুল অব ফাইন আর্টস’ নামের একটি আর্ট স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর কাছে যে-সব মানুষ এবং শিশু আশ্রয় নিয়েছিলো তাদের জন্য তিনি নিজের ঘর ছেড়ে দেন। জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি একটি চিড়িয়াখানা তৈরি করেন এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের জন্য সুন্দরী কাঠ দিয়ে একটি বড় আকারের নৌকাও তৈরি করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল শিশুরা সেই নৌকায় চড়ে সমুদ্র পরিভ্রমণে বের হবে আর শিল্পচর্চার উপকরণ খুঁজে পাবে।
এস এম সুলতানের আঁকা ছবিগুলোতে গ্রামীণ কৃষকদের দেখা যায় পেশীবহুল শক্তিশালী হিসেবে। আর গ্রামীণ রমণীদের দেখা যায় সুডৌল ও সুঠাম গড়নে। এর জবাবে তিনি নিজেই বলেন,
‘আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো-সেটাও রোগা। [আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা] মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি যে আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ইতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। অর্থবিত্ত ওরাই তো যোগান দেয়। আর এই যত জমিদার রাজা মহারাজা আমাদের দেশের কম কেউ না। সবাই তো কৃষিনির্ভর একই জাতির ছেলে। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রুগ্ন কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়, ফসল ফলায়।’
নড়াইলেন বিখ্যাত শিল্পী এসএম সুলতানকে শিল্পী মহলে টেনে আনলেন আরেক মনীষী আহমদ ছফা।
ছফা বলেন, ‘কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বাভাবিক আকুতি। … শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের অভিশাপে অভিশপ্ত।’
অভিশপ্ত কেন? মহৎ হয়েও তিনি জন্মেছেন অভিশপ্ত নগরে। যে নগর জানে না শিল্প কি, যে নগর বুঝে না সংস্কৃতি কি, যে নগরে স্থান নেই কোন মানুষের ভালোবাসার। অভিশপ্ত নগরীকে উদ্ধার করতেই প্রদীপ হাতে আসেন শিল্পীরা। সেই আলোয় পথ দেখাতে চায় মানুষকে।
তাঁর হাতের তুলি দিয়ে আঁকতে চায় মানুষের জীবন চিত্র। আর মানুষ তার সেই বীভৎস চেহারা দেখতে নারাজ। কেননা শিল্পীর আঁকা ছবিতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি পৃথিবীর প্রকৃতরূপ ফুটে উঠে। আমরা ঠুলি পড়ে যা দেখি না শিল্পী তাই দেখন তাই আমাদের দেখাতে চান। কে চায় নিজের এমন বীভৎস রূপ দর্শন করতে।
মানুষের শ্রমকে পুঁজি করে যারা আজ পুঁজিপতি। সেই মানুষ মরে যায় অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাবে। যাদের শ্রমে ইমারত গড়ে উঠে সেই মানুষ এত হ্যাংলা হবে কেন? সেই মানুষটির কেমন হওয়া উচিৎ সেই কথাই সুলতান তাঁর তুলিতে বলেছেন।
সুলতান বাংলাদেশের গ্রামীণজীবনের কৃষক ও কৃষিসমাজে খুঁজে পেয়েছিলেন নিজ জীবনের সুর ও ছন্দ। গ্রামীণ কৃষিসমাজের দৃশ্য ফুটে উঠেছে তার তুলিতে।
এসএম সুলতান-এর লেখা চিঠিপত্র থেকেই তাঁর জীবনের অবস্থা সম্পর্কে জানা জানা যায়। অবহেলার কারণে যেমন হারিয়ে ফেলি পরমতম শিল্পীকে তার সঙ্গে হারাই শিল্পীর সৃষ্ট শিল্পকে। অবহেলার কারণে তাঁর আঁকা অনেক ছবি কালর গর্ভে হারিয়ে গেছে। এর জন্য দায়ী আমরা। ইসলামের নামে ভাস্কর্য-চিত্র প্রভৃতি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে মৌলবাদীরা। শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের।
আমরা এখনো শিল্পের কদর করতে শিখিনি। কদর করতে না পারার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। পাশ্চাত্যের সভ্যরা আমাদের শিখিয়েছ নতুন দৃষ্টিতে দেখতে। আমরা এই দৃষ্টিতে দেখতে গিয়ে হারিয়েছি আমাদের স্বকীয়বোধ। আমরা না গ্রহণ করছি আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি না করছি নিজেদের মূল্যায়ন। আমরা আমাদের মূল চেতনাকে হারিয়ে বানের জলে ভাসতে চলেছি।
নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে গিয়ে আমরা আমাদের সম্পদকে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছি। যারা এই অমূল্য সম্পদ নিজেদের দখলে নিয়ে যাচ্ছে তারাই আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছে। যতদিন পর্যন্ত আমরা আমাদের নিজস্ব চেতনাকে ধারণ করতে না পারব ততদিন পর্যন্ত শিল্পী তার উপযুক্ত আসনে বসতে পারবে না।
চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে বিশ্ববরেণ্য এই চিত্রশিল্পী মৃত্যুবরণ করেন।
জন্মদিনে তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক, সহ-সম্পাদক, খবরওয়ালা।