খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৫০ পিএম
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে প্রায় দুই মাস নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা গেছেন পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মিজানুর রহমান মনির, যিনি মনির খান নামেও পরিচিত ছিলেন। বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে পুরোনো বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে হাসপাতালের শয্যায় তার হাতে হাতকড়া পরানো একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
মিজানুর রহমান পটুয়াখালী সদর উপজেলার বহালগাছিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং প্রয়াত আব্দুল খালেক খানের ছেলে। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সহসভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিন্টো রোড এলাকা থেকে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে ঢাকায় ছয়টি এবং পটুয়াখালী সদর উপজেলায় দুটি—মোট আটটি মামলা দায়ের করা হয়।
স্বজনদের দাবি, একাধিক মামলায় আদালত থেকে জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হওয়ায় তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। প্রায় ১১ মাস কারাবন্দি থাকার পরও ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন মামলার কারণে মুক্তি পাননি।
মিজানুর রহমানের ভাগনে সিরাজ মুন্সী জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় গত ৯ জুন তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তার অবস্থার অবনতি হলে কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুরোনো বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে তার চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই তার বিরুদ্ধে থাকা সর্বশেষ মামলাতেও আদালত জামিন মঞ্জুর করেন। তবে তখন তার শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে হাসপাতাল থেকেই তাকে আর সরানো সম্ভব হয়নি। আইনি বাধা কেটে গেলেও চিকিৎসাজনিত সংকটের কারণে তিনি হাসপাতালেই থেকে যান।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ডান হাতে হাতকড়া পরা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার, চিকিৎসা নৈতিকতা এবং অসুস্থ বন্দিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সম্পূর্ণ অচেতন ও সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা একজন রোগীর হাতে হাতকড়া রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।
মিজানুর রহমানের স্ত্রী সালমা জাহান, যিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, জানান যে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পরও প্রায় এক মাস তার স্বামীর হাতে হাতকড়া ছিল। তার ভাষ্য, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই দিনের মধ্যেই তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং স্বজনদেরও চিনতে পারতেন না। ধীরে ধীরে তার পুরো শরীর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
সালমা জাহান বলেন, চিকিৎসকেরা যখন জানিয়ে দেন যে রোগীকে সুস্থ করে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, তখন দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা তার হাত থেকে হাতকড়া খুলে দেন। কিন্তু ততক্ষণে তার শারীরিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। তার ভাষায়, শেষ সময়ে শিকল খুললেও জীবন আর ফেরানো যায়নি।
গত সপ্তাহে আইসিইউর সামনে ছেলের শারীরিক অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তার মা মাতোয়ারা বেগম। সে সময় তিনি বলেন, তার ছেলে আর তাকে চিনতে পারছে না। পরিবারের সদস্যদের মতে, দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক জটিলতার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছেই হার মানতে হয়েছে তাকে।
মিজানুর রহমানের চাচা আবদুল কালাম আজাদ জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাঠে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। পরে গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
এই ঘটনাটি শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নয়; বরং গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং মানবিক আচরণ নিয়ে চলমান বিতর্ককেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন একজন রোগীর হাতে দীর্ঘ সময় হাতকড়া থাকার বিষয়টি আইন, মানবাধিকার ও চিকিৎসা নীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে।
মন্তব্য