খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 5শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এক নতুন এবং অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে (Munich Security Conference) যোগ দেওয়া বিশ্বনেতাদের মধ্যে যে আলোচনাটি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে, তা হলো—ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিমালার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার আটলান্টিক জোটের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কীভাবে মেরামত করা সম্ভব। ডেমোক্র্যাট নেতা এবং ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘ আলাপে এটি স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মিত্ররা এখন আর অন্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করতে পারছে না।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম মিউনিখ সম্মেলনে যোগ দিয়ে একটি রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। সিএনএন-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইউরোপীয় নেতাদের সাথে তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছে এক গভীর আশঙ্কার কথা। মিত্ররা মনে করছেন, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের যে বুনন আলগা হয়েছে, তা হয়তো কোনোদিন আগের জায়গায় ফিরবে না। এমনকি ভবিষ্যতে কোনো ডেমোক্র্যাট নেতা প্রেসিডেন্ট হলেও ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ হিসেবে সেই হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়া হবে এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের বক্তব্য ইউরোপের নতুন ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে উন্মোচিত করেছে। তিনি একে ‘যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী শতাব্দী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মের্ৎস স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইউরোপ এখন আর পারমাণবিক নিরাপত্তার জন্য এককভাবে ওয়াশিংটনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চায় না। এই কারণেই তিনি ফ্রান্সের সাথে পৃথক বৈঠক করেছেন, যাতে ইউরোপীয় নিরাপত্তার একটি নিজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা যায়। তাঁর এই পদক্ষেপ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মিত্রদের গভীর অবিশ্বাসেরই প্রতিফলন।
নিচে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | ট্রাম্প-পূর্ববর্তী পরিস্থিতি | বর্তমান ও ট্রাম্প-পরবর্তী প্রেক্ষাপট |
| ন্যাটো ও নিরাপত্তা | যুক্তরাষ্ট্র ছিল ন্যাটোর অবিসংবাদিত নেতা ও রক্ষক। | ইউরোপ এখন নিজস্ব পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুঁজছে। |
| বিশ্ব নেতৃত্ব | মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ মানা হতো। | নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, ইউরোপ অনেকটা স্বতন্ত্র। |
| আন্তর্জাতিক চুক্তি | নিয়মভিত্তিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা ছিল। | নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে, ট্রাম্পের নীতিতে অনিশ্চয়তা। |
| অভ্যন্তরীণ রাজনীতি | দ্বিপাক্ষিক পররাষ্ট্র নীতি ছিল স্থিতিশীল। | রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র মেরুকরণ। |
মিউনিখ সম্মেলনে এক সময় রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন ছিলেন মধ্যমণি। কিন্তু এবারের দৃশ্যপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল বাতিল করায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নেতা উপস্থিত থাকতে পারেননি। হাতেগোনা কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা নিজস্ব উদ্যোগে উপস্থিত হয়ে ইউরোপকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর ছিল ক্ষীণ। জেসন ক্রোর মতো নেতারা স্বীকার করেছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং ট্রাম্পের পুনরুত্থান সেই ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করেছে।
গ্যাভিন নিউসম মনে করছেন, ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা এবং খামখেয়ালি আচরণ দেশের অভ্যন্তরে ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। নিউসমের মতে, বিশ্ব ধীরে ধীরে এই সত্য উপলব্ধি করছে যে ট্রাম্পের প্রভাব স্থায়ী নয়, তবে তিনি যে ক্ষত রেখে যাচ্ছেন তা দীর্ঘমেয়াদী। ইউরোপীয় নেতারা এখন আর ২০১৬ সালের ট্রাম্পের জয়কে কোনো ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখছেন না; বরং একে বিশ্ব রাজনীতির একটি স্থায়ী পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করে নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজতে শুরু করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনটি ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রতি ইউরোপের এক ধরনের আল্টিমেটাম। নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যদি ভেঙে পড়ে, তবে ইউরোপ যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় বসে থাকবে না—ফ্রিডরিখ মের্ৎস এবং জেসন ক্রোর আলাপে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।