খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়েছে। সাধারণত প্রতি বছর ২৯ মে বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি উদযাপিত হলেও, বাংলাদেশে ঈদের ছুটি থাকার কারণে নির্ধারিত দিনের পরিবর্তে বুধবার দেশব্যাপী দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা হয়। ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের পর থেকে বিগত ৩৮ বছরে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অন্যতম এক গর্বিত অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপনের সফল আয়োজনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খান। ২০০৭ সালে তিনি সেনাবাহিনী সদর দপ্তরের ওভারসিজ অপারেশনস ডিরেক্টরেটের পরিচালক (চেয়ারম্যান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার সুনিপুণ তত্ত্বাবধানে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গৌরবময় অবদানকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে তুলে ধরে।
এই সফল আয়োজনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭ সালের ৩১ মে জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী রেনাটা লোক-দেসালিয়েন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব হায়দার খানকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও উচ্চসিত প্রশংসা জ্ঞাপন করেন। রেনাটা লোক-দেসালিয়েন উল্লেখ করেন যে:
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের সামনে শান্তিরক্ষীদের অনন্য অবদান ও আত্মত্যাগ তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সফল বাস্তবায়নে আয়োজকদের নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মনিবেদিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল।
আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিরা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অর্জন সম্পর্কে একটি বিস্তৃত, সুনির্দিষ্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন।
১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান সামরিক পর্যবেক্ষক (UNIIMOG) মিশনে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হয়। পরবর্তীকালে দেশের অন্যান্য বাহিনীও এই গৌরবময় যাত্রায় অংশ নেয়। বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে জাতিসংঘ পরিবারে যুক্ত হয়। এরপর ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা মিশনে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত বাংলাদেশের চার বাহিনীর অবদান, মোট অংশগ্রহণকারী এবং জীবন উৎসর্গকারী সদস্যদের পরিসংখ্যান নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বাহিনীর নাম | মিশন শুরুর বছর | মোট অংশগ্রহণকারী শান্তিরক্ষী | জীবন উৎসর্গকারী সদস্য |
| বাংলাদেশ সেনাবাহিনী | ১৯৮৮ | ১,৬২,০৩৫ জন | ১৩৮ জন |
| বাংলাদেশ পুলিশ | ১৯৮৯ | ২১,৮২৮ জন (নারী: ১,৯২৮ জন) | ২৪ জন |
| বাংলাদেশ নৌবাহিনী | ১৯৯৩ | উৎস সংবাদে উল্লিখিত নয় | ৪ জন |
| বাংলাদেশ বিমানবাহিনী | ১৯৯৩ | উৎস সংবাদে উল্লিখিত নয় | ৯ জন |
| সর্বমোট | ১৯৮৮ | ২,০৬,৪৭৬ জন (নারী: ৩,৬৪৫ জন) | ১৭৫ জন |
ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা এ পর্যন্ত বিশ্বের ৪৩টি দেশ ও স্থানে মোট ৬৩টি জাতিসংঘ মিশন সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। বিশ্বশান্তি রক্ষায় এই সুদীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের মোট ২ লাখ ৬ হাজার ৪৭৬ জন শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে নারী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা ৩ হাজার ৬৪৫ জন। এর মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাদেশ পুলিশ থেকেই ২৫টি দেশের ২৭টি মিশনে ১ হাজার ৯২৮ জন নারী সদস্যসহ মোট ২১ হাজার ৮২৮ জন সদস্য অংশ নিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। বর্তমানে জাতিসংঘের ৯টি সক্রিয় শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৪১২ জন শান্তিরক্ষী নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের বহু প্রতিকূলতা ও ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। মিশন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট ১৭৫ জন বীর শান্তিরক্ষী বিশ্বমঞ্চে কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৩৮ জন, নৌবাহিনীর ৪ জন, বিমানবাহিনীর ৯ জন এবং পুলিশ বাহিনীর ২৪ জন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালনকালে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের মোট ২৮৭ জন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। এই মহান আত্মত্যাগ ও গৌরবময় অবদান বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।