এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা, প্রাচীন বাংলা পুঁথির নিরলস সংগ্রাহক ও ব্যাখ্যাকার, অনন্য এক আলোকবর্তিকা ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ।
১৮৭১ সালের ১১ অক্টোবর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে বিভাগীয় স্কুল পরিদর্শক পদে আসীন হন এবং ১৯৩৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু নিবন্ধ রচনার মাধ্যমে। অচিরেই তিনি তৎকালীন সাহিত্যজগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিশেষত, মধ্যযুগে মুসলমান কবিদের সাহিত্যকীর্তি অনুসন্ধানই ছিল তাঁর আজীবন সাধনা।
তিনি সারা জীবন ধরে প্রায় ১৭০০ প্রাচীন বাংলা পুঁথি সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম কবিদের লেখা, যা তিনি দান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত এই মহামূল্যবান সম্পদ আজও গবেষণার অমূল্য ভান্ডার। হিন্দু কবিদের লেখা অবশিষ্ট পুঁথি তিনি দান করেন রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে।
তাঁর সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি থেকে প্রায় ১০০ জন অজানা মুসলিম কবিকে আমরা জানতে পেরেছি। দৌলত কাজী, আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মুহম্মদ খান প্রমুখের মতো কবিদের বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের দলিল তিনি বিশ্বসমক্ষে উন্মোচিত করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়—বাংলা মুসলমানদেরও নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্যভাণ্ডার ছিল।
‘বাংলা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ’ (দুখণ্ড), ‘ইসলামাবাদ’, এবং মুহম্মদ এনামুল হকের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত ‘আরাকান রাজসভায় বাঙলা সাহিত্য’সহ বহু পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। তিনি মোট এগারোটি প্রাচীন বাংলা গ্রন্থ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নদীয়া সাহিত্য সভা তাঁকে ‘সাহিত্যসাগর’ এবং চট্টল ধর্মমণ্ডলী তাঁকে ‘সাহিত্য বিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করে। শেষোক্ত উপাধি তিনি আজীবন নিজের নামে ধারণ করেছিলেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগতিতে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। নিভৃত সাধনা ও অমিত পাণ্ডিত্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এই মহৎ মনীষী পরলোকগমন করেন। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এমএজেড