খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও শক্তিশালী ইংল্যান্ড। বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে গড়াবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ। মাঠের দুই দলের লড়াই যতটা রোমাঞ্চ ছড়াচ্ছে, মাঠের বাইরে ততটাই আলোচনা শুরু হয়েছে এই ম্যাচের দায়িত্ব পাওয়া রেফারিকে নিয়ে। গুরুত্বপূর্ণ এ ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন মরক্কোয় জন্ম নেওয়া মার্কিন রেফারি ইসমাইল এলফাথ। ৪৪ বছর বয়সী অভিজ্ঞ এই রেফারি চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন।
অভিজ্ঞতার ঝুলিতে টান না থাকলেও মাঠের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে বেশ কয়েকবার সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন এলফাথ। আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের জন্য অবশ্য তিনি একেবারে অপরিচিত নন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল, তখন ডাগআউটের পাশে চতুর্থ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন এই এলফাথ। এবার প্রধান রেফারি হিসেবেই তিনি বাঁশি হাতে আলবিসেলেস্তেদের সেমিফাইনাল সামলাবেন।
চলতি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব ও নকআউট মিলিয়ে নেদারল্যান্ডস বনাম জাপান, স্পেন বনাম উরুগুয়ে এবং ব্রাজিল বনাম নরওয়ের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন এলফাথ। এই তিন ম্যাচে তিনি মোট আটটি হলুদ কার্ড এবং একটি লাল কার্ড দেখিয়েছেন। একমাত্র লাল কার্ডটি তিনি দেখান স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকল করার দায়ে উরুগুয়ের ফুটবলার আগুস্তিন কানোব্বিওকে। ওই ম্যাচে উরুগুয়ে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর এলফাথের সিদ্ধান্ত নিয়ে লাতিন আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক হয়।
বিশেষ করে স্পেন ও উরুগুয়ের ম্যাচটিতে তার রেফারিং নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। স্প্যানিশ ও উরুগুয়ান দুই দেশের সংবাদমাধ্যমই দাবি করেছিল, ম্যাচের গতি ও নিয়ন্ত্রণ শুরু থেকেই তিনি ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারেননি। মাঠে অতিরিক্ত শারীরিক সংঘর্ষের সুযোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি বারবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। রদ্রিগো বেনতানকুরের একটি কড়া ট্যাকলে তারকা ফরোয়ার্ড ইনাকি উইলিয়ামস গুরুতর চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন এবং পরবর্তী কয়েকটি ম্যাচ থেকে ছিটকে যান। এত বড় ঘটনার পরও এলফাথ কেবল হলুদ কার্ড দিয়ে পার করে দেন, যা ভালোভাবে নেয়নি ফুটবল বিশ্লেষকরা।
তার রেফারিং নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল ব্রাজিল ও নরওয়ের ম্যাচেও। মাঠের ভেতরের সাধারণ ফাউলকে ঘিরে জল ঘোলা করার রেকর্ড আছে তার। নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আজারের কড়া চ্যালেঞ্জে ব্রাজিলের ম্যাথেউস কুনহা বক্সের ভেতর পড়ে গেলেও প্রথমে পেনাল্টির বাঁশি বাজাননি এলফাথ। পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) হস্তক্ষেপে নিজের সিদ্ধান্ত বদলান তিনি। ওই যাত্রায় ব্রুনো গিমারায়েস স্পট কিক মিস করলেও পরবর্তীতে ম্যাচের অন্য একটি পেনাল্টি থেকে নেইমার গোল করতে ভুল করেননি। অবশ্য পেনাল্টি পেলেও সেই ম্যাচে ব্রাজিলের শেষ রক্ষা হয়নি। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথেই মাঠের ফুটবলারদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় বেড়ে ওঠা এলফাথের জীবন বেশ বৈচিত্র্যময়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল খেলতেন। পরে খেলোয়াড়ি জীবন ছেড়ে পেশাদার রেফারিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন। ২০০১ সালে ঐতিহ্যবাহী ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) লটারির মাধ্যমে আমেরিকার স্থায়ী নাগরিকত্ব পেয়ে যান তিনি।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফার রেফারিদের তালিকায় নাম লেখান এলফাথ। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার জনপ্রিয় লিগ মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) ম্যাচ পরিচালনা করে আসছেন তিনি। ফলে ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলা আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসির খেলা পরিচালনা করার পূর্ব অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। ২০২৩ সালের লিগস কাপের ফাইনালে যখন ইন্টার মিয়ামি ও ন্যাশভিলের রোমাঞ্চকর লড়াই হয়েছিল, সেই ম্যাচেও প্রধান রেফারি ছিলেন তিনি। টাইব্রেকারে সেই ম্যাচ জিতেই মেসি আমেরিকার মাতিতে নিজের প্রথম শিরোপার স্বাদ পেয়েছিলেন।
ফিফা বিশ্বকাপের পাশাপাশি অলিম্পিক গেমস, কোপা আমেরিকা, গোল্ড কাপ, অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় আসরগুলোতে ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। টোকিও ২০২০ অলিম্পিকেও আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচে রেফারির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অনূর্ধ্ব-২৩ দলের সেই ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হওয়ায় গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। সেই স্কোয়াডে থাকা বর্তমান জাতীয় দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ মুখ ফাকুন্দো মেদিনা ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার মাঠের সেই অম্লমধুর অভিজ্ঞতার কথা হয়তো এখনও ভোলেননি।
কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের সফল অভিযানের পর এটি এলফাথের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। গত আসরে তিনি পর্তুগাল বনাম ঘানা, ক্যামেরুন বনাম ব্রাজিল এবং জাপান বনাম ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার নকআউট ম্যাচগুলো সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার রোমাঞ্চকর এ সেমিফাইনাল ম্যাচে তার সহকারী হিসেবে মাঠের দুই প্রান্তে পতাকা হাতে থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের কোরি পার্কার ও কাইল অ্যাটকিনস। পাশাপাশি ডাগআউটে চতুর্থ কর্মকর্তা হিসেবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবেন ইতালির মাউরিজিও মারিয়ানি। উত্তেজনায় ঠাসা এই ম্যাচে রেফারিং নিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক তৈরি হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।