খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
২০২৫ সাল বাংলাদেশের সংগীত জগতের জন্য ছিল বৈপরীত্যে ভরা এক বছর। একদিকে সিনেমা, নাটক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কিছু গান শ্রোতার হৃদয়ে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে, অন্যদিকে অডিও গানের বাজার রয়ে গেছে প্রায় স্থবির। শীর্ষ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো টানা কয়েক বছর ধরেই অডিও গান প্রকাশে অনাগ্রহী, যা এই খরাকে আরও প্রকট করেছে। এর বিপরীতে সিনেমার গানই আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত গানের তালিকার শীর্ষে নিঃসন্দেহে থাকবে কোক স্টুডিও বাংলায় প্রকাশিত রুনা লায়লার ‘দমা দম মাস্ত কালান্দার’। কিংবদন্তি এই শিল্পীর কণ্ঠে নতুন সংগীতায়োজনে গানটি মুক্তির আগেই ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করেছিল। মুক্তির পর শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস প্রমাণ করেছে—ভালো গান এখনো প্রজন্ম পেরিয়ে সংযোগ তৈরি করতে পারে।
এরপরই আসে হাবিব ওয়াহিদের ‘মহাজাদু’। তাজিকিস্তানের শিল্পী মেহেরনিগর রুস্তমের সঙ্গে এই ফিউশন লোকগানটি বছরের অন্যতম সেরা সংগীতপ্রয়াস হিসেবে বিবেচিত। লোকগানের আধুনিক উপস্থাপন যে এখনো শ্রোতাদের আকর্ষণ করে, সেটিই আবার প্রমাণ করেছেন হাবিব।
কোক স্টুডিও থেকেই আলোচনায় ছিল ‘লং ডিসট্যান্স লাভ’। তরুণ শিল্পী অঙ্কন কুমার ও শেখ মুমতাহিনা মেহজাবিন আফরিনের কণ্ঠে রোমান্টিক এই গানটি বছরজুড়ে প্লেলিস্টে জায়গা করে নেয়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ২০২৫ সালে বেশ কিছু গান ভিউয়ের দিক থেকেও ঈর্ষণীয় সাফল্য পায়।
ঈশান মজুমদারের ‘গুলবাহার’ তিন কোটির বেশি ভিউ ছাড়িয়ে যায়।
সাইফ জোহানের ‘কিছু মানুষ মরে যায় পঁচিশে’ গানটি কথার গভীরতায় ও সুরের সংবেদনশীলতায় প্রায় দুই কোটি দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়।
পারভেজ খানের ‘আমার বন্ধুরও বন্ধু আছে’ এবং মরিয়ম ইসলামের ‘রাগের মাথায় কইলে কিছু রাইখো না অন্তরে’—এই দুই গান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রেন্ড তৈরি করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সানজিদা রিমির ‘তুই আমার আলতা চুড়ি না’, যা বছরের শুরুতেই মুক্তি পেয়ে পাঁচ কোটির বেশি ভিউ অর্জন করে।
২০২৫ সালে সিনেমার গানই ছিল সংগীত জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ।
‘বরবাদ’ সিনেমার ‘চাঁদমামা’ ও ‘মহামায়া’,
‘তাণ্ডব’-এর ‘লিচুরও বাগানে’,
‘জিন-৩’-এর ‘কন্যা’,
এবং ‘জংলি’ সিনেমার ‘বন্ধু গো শোনো’—এই গানগুলো প্রমাণ করেছে, সিনেমার গান এখনো শ্রোতার প্রধান বিনোদন।
নাটকের গানও ২০২৫ সালে পিছিয়ে ছিল না।
হাবিব ওয়াহিদ ও ন্যান্সির ‘আমার দিনগুলো সব হারিয়ে যায় আঁধারে’ গানটি ২ কোটি ৪০ লাখ ভিউ ছাড়িয়েছে।
কনা ও সজীব দাসের ‘যদি মনটা করি চুরি’ এবং ‘এত প্রেম এত মায়া’ নাটকের গানগুলোও শ্রোতাপ্রিয়তার তালিকায় জায়গা করে নেয়।
গানের জনপ্রিয়তার বিপরীতে ২০২৫ সাল ছিল কনসার্ট শিল্পের জন্য সবচেয়ে হতাশাজনক সময়গুলোর একটি। নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক কনসার্ট বাতিল ও স্থগিত হয়।
ঢাকায় আতিফ আসলামের কনসার্ট,
জেমস ও আলী আজমতের যৌথ কনসার্টসহ
ডিসেম্বরে ঘোষিত কমপক্ষে ১০টি কনসার্ট বাতিল হয়।
এর ফলে শিল্পী, মিউজিশিয়ান ও আয়োজকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। স্টেজ শোর মৌসুম শুরু হলেও বাস্তবে তা সংগীতশিল্পীদের জন্য হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তার প্রতীক।
২০২৫ সাল প্রমাণ করেছে—
ভালো গান এখনো শ্রোতা খুঁজে নেয়,
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নতুন শিল্পীদের সামনে আনে,
কিন্তু লাইভ মিউজিক ও অডিও ইন্ডাস্ট্রি বড় সংকটে।
এই বছর তাই বাংলাদেশের সংগীত জগতের ইতিহাসে স্মরণীয় থাকবে গানের সাফল্য ও কনসার্টের ব্যর্থতার দ্বন্দ্বময় বছর হিসেবে।