খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
ইরানকে খণ্ডিত করে দেশটির বিপুল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন অভিযোগ তুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। সোমবার (৯ মার্চ) তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি কড়া ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের পেছনে ইরানের সার্বভৌমত্ব দুর্বল করার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখছে। তার মতে, ইরানের বিশাল জ্বালানি সম্পদ—বিশেষ করে তেল ও গ্যাস—এই অঞ্চলে মার্কিন আগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি বলেন, “ওয়াশিংটনের নীতির পেছনের উদ্দেশ্য এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। তারা ইরানের রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল করে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অবৈধভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।”
ইরানি মুখপাত্র আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থেই নয়, বরং ইরানি জনগণের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যেও বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে। তার ভাষায়, এই ধরনের কৌশল আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির পরিপন্থী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ইরানের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষায় দেশটির জনগণ ও সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ইরানকে খণ্ডিত করার যেকোনো ষড়যন্ত্র বা প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই এ ধরনের মন্তব্য এসেছে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত বিচ্ছিন্ন। এরপর বিভিন্ন সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের বিপুল জ্বালানি সম্পদও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নিচের সারণিতে ইরানের জ্বালানি সম্পদ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো—
| সূচক | পরিমাণ (আনুমানিক) | বৈশ্বিক অবস্থান |
|---|---|---|
| প্রমাণিত তেল মজুত | প্রায় ১৫৭ বিলিয়ন ব্যারেল | বিশ্বের শীর্ষ ৫ |
| প্রমাণিত গ্যাস মজুত | প্রায় ৩৪ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার | বিশ্বের শীর্ষ ২ |
| দৈনিক তেল উৎপাদন | প্রায় ৩–৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেল | মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক |
| প্রধান রপ্তানি বাজার | এশিয়া ও আঞ্চলিক দেশসমূহ | কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন |
পর্যবেক্ষকদের মতে, আঞ্চলিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি—এই তিনটি বিষয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তেহরানের এ ধরনের বক্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে। অন্যথায় চলমান উত্তেজনা কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।