খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে কে কখন ধ্বংস হয় বলা মুশকিল। অন্তত আগামী ২৪ ঘণ্টায় এর কোনো পূর্বাভাস নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার নিজেই এই ‘বিপজ্জনক’ ইঙ্গিত দিয়ে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে বলেন, ‘আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বোঝা যাবে ইসরায়েলের হামলার গতি কমবে না বাড়বে।’
ট্রাম্প গত মঙ্গলবারের আরেক পোস্টে বলেছেন, ‘ইরানের আকাশ এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে।’ পরক্ষণেই বললেন, ‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কোথায় লুকিয়ে আছেন আমরা জানি। কিন্তু তাকে আমরা এখনই হত্যা করব না।’ তারপরই আবার বললেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে ইরানকে।’ সে হিসাবে আগামী ২৪ ঘণ্টা পর কী ঘটতে যাচ্ছে; কী হবে তা পুরোটাই ধোঁয়াশায়!
সংঘাতের ষষ্ঠ দিনে প্রথমবারের মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে এএফপি।
ইরানের দাবি, ‘ফাত্তাহ’ নামের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে সফলভাবে প্রবেশ করেছে।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, বুধবার ভোরে অপারেশন ট্রু প্রমিজ থ্রির একাদশ পর্যায়ে উন্নত ‘ফাত্তাহ’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। সফলভাবে বহুল আলোচিত ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ইসরায়েল এবং তাদের পশ্চিমা সমর্থকদের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। ইসরায়েলের আকাশের ওপরও নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে জানিয়েছে ইরান।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অপারেশন ট্রু প্রমিজ থ্রির মুখপাত্র কর্নেল ইমান তাজিক বলেছেন, ‘মঙ্গলবার রাতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে এটা প্রমাণিত ইসরায়েলের আকাশের ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।’
পালটা হামলা চালিয়েছে ইয়েরায়েলও। তেহরান থেকে ৪০ কিমি. দূরের আলবোর্জ প্রদেশের রাজ শহরের পায়াম বিমানবন্দরের কাছে হামলা চালায়। এর আগেও এই বিমানবন্দরটিই ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। তেহরানের পূর্বাঞ্চল থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে এখন পর্যন্ত এসব বিস্ফোরণের লক্ষ্যবস্তু বা ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এদিন দাবি করেছেন, তাদের যুদ্ধবিমান ইরানি সরকারের ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সদর দপ্তর’ ধ্বংস করেছে। শুক্রবার থেকে এ পর্যন্ত দেশটির ১১শ লক্ষ্যবস্তুতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। ইসরায়েলের এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, ইরানে এ পর্যন্ত ৪০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১০০০ ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
বুধবার এক এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে আইএইএ জানায়, ইরানি সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন কেন্দ্র টিইএসএ কারাজ ও তেহরান রিসার্চ সেন্টারে হামলা হয়েছে। দুটি কেন্দ্রই এক সময় আইএইএর নজরদারির আওতায় ছিল। এর আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করে, ৫০টির বেশি যুদ্ধবিমান ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের ৪০টি লক্ষবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন কেন্দ্রসহ একাধিক অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র। টেলিগ্রামে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ব্যাপক প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা নির্দেশনার ভিত্তিতে এই হামলা চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক অধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস বলছে, ইরানজুড়ে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৮৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত ১ হাজার ৩২৬ জন। খবর আলজাজিরার।
সংগঠনটি বলেছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩৯ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১২৬ জন নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যকে তারা শনাক্ত করতে পেরেছে। ইসরায়েলি হামলায় হতাহতের বিষয়ে সর্বশেষ সোমবার তথ্য জানিয়েছে ইরান সরকার। দেশটির সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২২৪। আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৭৭ জন মানুষ। খবর আলজাজিরার।
চলমান সংঘাতে ইরান সরকার নিয়মিত হতাহতের তথ্য প্রকাশ করছে না। সবশেষ সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল সোমবার। সেই তথ্য অনুসারে, ২২৪ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৭৭ জন মানুষ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা গোলান মালভূমির দক্ষিণাঞ্চলে অনুপ্রবেশকারী একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ড্রোনটি ইরানি ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, সিরিয়ার ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমির দক্ষিণ অংশে ড্রোনটি ঢোকার পর সেখানে সতর্কতা সংকেত (অ্যালার্ট) চালু হয়। এরপরই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটি গুলি করে নামানো হয়। ড্রোনটি ইরান থেকে সরাসরি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে। ঘটনার সময় বা ড্রোনের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সেনাবাহিনী। তবে ঘটনার সময় ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা তুঙ্গে থাকায় বিষয়টি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যস্থতা করতে ইরানের আলোচকেরা হোয়াইট হাউজে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছে ইরান। ইরানের জাতিসংঘ মিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতির বরাত দিয়ে আলজাজিরার খবরে বলা হয়, কোনো ইরানি কর্মকর্তা কখনো হোয়াইট হাউজের দরজায় মাথা নোয়াতে যায়নি। তার (ট্রাম্প) মিথ্যার চেয়ে আরও ঘৃণ্য বিষয় হলো তার কাপুরুষোচিত হুমকি। তিনি (ট্রাম্প) হুমকি দিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করবেন। ইরানের মিশন আরও জানিয়েছে, ইরান জোর-জবরদস্তিতে আলোচনা করে না, চাপিয়ে দেওয়া শান্তি গ্রহণ করবে না।
খবরওয়ালা/এমইউ