মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান রোববার (১৫ মার্চ) পর্যন্ত টানা ১৬ দিনে গড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে উভয় দেশ ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরানও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই সংঘাতের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েল তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত ‘ইন্টারসেপ্টর’ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সেমাফোরের প্রতিবেদনে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, ইসরায়েল চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তাদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে এসেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই সংকট আরও প্রকট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইসরায়েলের এই প্রতিরক্ষা সংকট নতুন নয়। গত কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত এখনো স্থিতিশীল রয়েছে এবং তা নিয়ে কোনো তাৎক্ষণিক সংকট নেই বলে জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহায়তায় গড়ে উঠেছে। দেশটির বহুল পরিচিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আইরন ডোম’, ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ‘অ্যারো’ সিস্টেম মূলত বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে ইরানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নিচের টেবিলে ইসরায়েলের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো—
| প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | প্রধান কাজ | লক্ষ্যবস্তু |
|---|---|---|
| আইরন ডোম | স্বল্প-পাল্লার রকেট প্রতিরোধ | গাজা বা সীমান্ত এলাকা থেকে ছোড়া রকেট |
| ডেভিডস স্লিং | মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ | দূরপাল্লার রকেট ও ক্রুজ মিসাইল |
| অ্যারো সিস্টেম | ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ | দীর্ঘ-পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল |
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি ধারাবাহিকভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। কারণ প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও মোতায়েনের খরচ অত্যন্ত বেশি এবং সেগুলোর উৎপাদনও সীমিত।
এদিকে ইসরায়েলি নেতৃত্ব জানিয়েছে, ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে ইরানও জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক বিস্তার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পুরো অঞ্চলে আরও ব্যাপকভাবে অনুভূত হতে পারে।