খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
বিশ্বের জ্বালানি বাজারে ইরান-সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি রাস্তা হরমুজ প্রণালিতে যে ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে, তার প্রভাব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি সরবরাহে এই ঝুঁকি শুধুমাত্র খুচরা বাজারকে প্রভাবিত করছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদনের ওপরও সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু দেশ এই সংকটে সবচেয়ে ভঙ্গুর। জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্য—এই দেশগুলোর শিল্প ও বিদ্যুতের চাহিদা জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জার্মানিতে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতালিতে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় দেশটির গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে প্রভাব পড়বে। আর যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতা জ্বালানি মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
এশিয়া মহাদেশে জাপান ও ভারতও বড় ঝুঁকির মুখে। জাপান তার তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যেখানে অধিকাংশ শিপমেন্ট হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে আসে। যেকোনো বাধা হলে সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হবে এবং দেশটির শিল্প ও অর্থনীতি সরাসরি চাপে পড়বে। ভারতের তেল ও এলপিজি আমদানিও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ইতিমধ্যে ভারতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে এবং মুদ্রার মান কমছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থা আরও গুরুতর। কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো পুরোপুরি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি বন্ধ হলে দেশগুলোর জাতীয় অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার কিছু দেশ—শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও মিশর—আছেন। ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় এই দেশগুলোতে তেল ও গ্যাস সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ রেশনিং এবং বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নিচের টেবিলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রধান তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| দেশ | প্রধান ঝুঁকি | জ্বালানি উৎস/নির্ভরতা | অর্থনৈতিক প্রভাব |
|---|---|---|---|
| জার্মানি | শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি | তেল ও গ্যাস (মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া) | পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া |
| ইতালি | তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা | মধ্যপ্রাচ্য | গৃহস্থালি ও শিল্প খাত প্রভাবিত |
| যুক্তরাজ্য | গ্যাসচালিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভর | মধ্যপ্রাচ্য | বিদ্যুৎমূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি |
| জাপান | তেলের ৯০% আমদানি | মধ্যপ্রাচ্য, হরমুজ প্রণালি | সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ |
| ভারত | তেল ও এলপিজি আমদানির ওপর নির্ভর | মধ্যপ্রাচ্য | প্রবৃদ্ধি হ্রাস, মুদ্রার মান কমে যাওয়া |
| কুয়েত | রপ্তানি বিঘ্ন | হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল রপ্তানি | অর্থনীতি সংকুচিত |
| কাতার | রপ্তানি বিঘ্ন | হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে গ্যাস রপ্তানি | জাতীয় আয় হ্রাস |
| বাহরাইন | রপ্তানি বাধা | হরমুজ প্রণালি | অর্থনৈতিক সংকট |
| শ্রীলঙ্কা | তীব্র জ্বালানি সংকট | আমদানির ওপর নির্ভরতা | তেল, বিদ্যুৎ, মুদ্রাস্ফীতি |
| পাকিস্তান | তীব্র জ্বালানি সংকট | তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা | অর্থনৈতিক চাপ, ঋণ বৃদ্ধি |
| মিশর | জ্বালানি সংকট | তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা | মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা |
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি ইরান-সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ চেইন ও অর্থনীতিই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এই মুহূর্তে বিশ্বের নীতি-নির্ধারক ও অর্থনৈতিক সংস্থা গুলো সর্তক অবস্থান নিয়েছে।