খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুলাই ২০২৫, ৪:২৯ পিএম
ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সামরিক সংঘাতকে সফল বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। দেশটির মতে, এ অভিযানে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক নেতা হত্যা করা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় অংশ নিতে রাজি করানো সম্ভব হয়েছে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রয়োজনে তারা আবারও হামলা চালাতে প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, ‘গ্যাসের প্যাডাল থেকে পা তোলার কোনো ইচ্ছা নেই।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল আবারও ইরানকে লক্ষ্য করে ধ্বংসাত্মক একটি যুদ্ধ শুরুর সুযোগ খুঁজছে। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থন জরুরি, যা এখনো অনিশ্চিত। গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় এক হাজারের বেশি ইরানি ও ২৯ জন ইসরায়েলি নিহত হন। ইসরায়েল এ হামলাকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ পদক্ষেপ বলে দাবি করে, যদিও ইরান বারবার তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে আসছে।
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে তাঁর দেশ। তিনি জানান, ইরানি বাহিনী আবারও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে গভীরে আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যুদ্ধের সময় ইরান দাবি করেছিল, তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হলেও, মূলত দেশটির সামরিক ও প্রশাসনিক শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের হত্যা করাই ছিল ইসরায়েলের লক্ষ্য। বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সির মতে, নেতানিয়াহু ইরানকে সিরিয়া ও লেবাননের মতো একটি দেশে পরিণত করতে চান, যাতে ইসরায়েল নির্দ্বিধায় হামলা চালাতে পারে।
এদিকে, ইসরায়েল নতুন করে যুদ্ধের অজুহাত পেতে পারে যদি ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগস্টের মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে জাতিসংঘের পুরোনো নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হবে। বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকেও সরে দাঁড়াতে পারে, যা ইসরায়েলের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।
তবে ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা চালানোর আগে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে হবে বলে মনে করেন ইরান-বিষয়ক বিশ্লেষক মেইর জাভেদানফার। তিনি মনে করেন, এমন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্মতি ছাড়া এগিয়ে যাওয়া ইসরায়েলের পক্ষে কঠিন।
ইসরায়েলের সরাসরি হামলার সম্ভাবনা আপাতত কম হলেও, নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানজুড়ে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পেছনে ইসরায়েলের গোপন অভিযান জড়িত থাকতে পারে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বিস্ফোরণ, তেল শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ড, বিমানবন্দরের কাছে এবং একটি জুতার কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক নেগার মরতাজাভি জানান, নেতানিয়াহু এমন এক কৌশল বেছে নিয়েছেন, যা দিয়ে ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি ইরানকে আঘাত হানতে পারছেন। বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, গত জুনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে ঢুকে পড়ে এবং স্থানীয় গোয়েন্দা ও ড্রোন ব্যবহার করে অভিযান চালায়। এই গোপন নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে।
নেতানিয়াহু অতীতে সংযত নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও গাজায় যেভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে, তা গাজা ইস্যুতে তাঁর প্রতি অভ্যন্তরীণ বিরোধী মনোভাব থেকে দৃষ্টি সরাতে সহায়ক হতে পারে।
ইরান-ইসরায়েল ইস্যুতে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক ঐক্য রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ইরান নিয়ে ইসরায়েলে ভিন্নমত নেই। নেতানিয়াহু যদি নিজেকে রাজনৈতিক সংকটে পড়া মনে করেন, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার কৌশল নিতেই পারেন।
তবে ইরান এবার আর আগের মতো অপ্রস্তুত থাকবে না। তারা এখনো কূটনৈতিকভাবে নতুন পারমাণবিক চুক্তির পথ খোলা রাখলেও, বিশ্বাস করে— নতুন চুক্তি হলে ইসরায়েলি আগ্রাসনের ঝুঁকি কমবে।
খবরওয়ালা/এন
মন্তব্য