খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ভাদুঘরের শান্তিনগরের মাঠজুড়ে তখন নীরবতা। চারদিকে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা—দুপুরে শাপলা তুলতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া দুই ভাই-বোনের খোঁজে ছুটছিল পুরো এলাকা। অবশেষে পরদিন সকালে বাড়ির পাশের ডোবা থেকে উদ্ধার হয় ১১ বছর বয়সী হোসাইন ও ৮ বছরের জিন্নাতের নিথর দেহ।
তাদের এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই শোকের ঘটনা। এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে দেশে। কোথাও শাপলা তোলার আনন্দ, কোথাও ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাওয়া—একটি অসতর্ক মুহূর্ত আর অরক্ষিত জলাশয় কেড়ে নিচ্ছে শিশুর জীবন।
জাতিসংঘ ঘোষিত ২৫ জুলাই, বিশ্ব ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। এ উপলক্ষে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে বাংলাদেশ ২০২৪–এর তথ্য।
এই জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছেন গড়ে ৫১ জন, যার ৭৫ শতাংশই শিশু। ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালানো এই জরিপে ১ লাখ ১১ হাজার পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণাটি করেছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কারিগরি ও অর্থায়নে। সহায়তা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
সিআইপিআরবির পরিচালক এবং গবেষণা দলের প্রধান সেলিম মাহমুদ চৌধুরী জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু এবং তারাও মারা যাচ্ছে নিজেদের বাড়ির পাশের জলাশয়ে—পুকুর, ডোবা কিংবা খালেই ঘটে ৭০ শতাংশ মৃত্যু।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছেন প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন মানুষ। এর মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ১ থেকে ৪ বছর বয়সীরা।
জরিপে আরও দেখা গেছে, দেশের প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৬০ জন মারা যায় আঘাতজনিত কারণে। এসব মৃত্যুর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা (১৫%), আত্মহত্যা (১২.৪২%) এবং পানিতে ডোবা (১১%) প্রধান কারণ।
শিশুদের ডুবে মৃত্যু রোধে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন, এখন ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় একটি প্রকল্প চালাচ্ছে। এখানে ১–৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য রয়েছে দিবাযত্ন কেন্দ্র, আর ৬–১০ বছর বয়সীদের শেখানো হচ্ছে সাঁতার।
এই প্রকল্পের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তারিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘যেসব এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, সেখানে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে।’
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এতটুকু উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দুর্যোগবিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রের চেয়ে সমাজভিত্তিক উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।’
এই বিশ্ব ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবসে প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতিদিন যে শিশুগুলো অকালে হারিয়ে যাচ্ছে, তাদের রক্ষায় আমরা কতটা প্রস্তুত? এখনই সময় আরও কার্যকর, সম্প্রসারিত উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ এই মৃত্যুগুলো আর কেবল সংখ্যা নয়—প্রতিটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি।
খবরওয়ালা/শরিফ