খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে চৈত্র ১৪৩২ | ১৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের চা শিল্পে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট—এই পাঁচ জেলায় গত বছর চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ২১ শতাংশই আসছে এই অঞ্চল থেকে, যা উত্তরবঙ্গকে দেশের চা শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে দেশে মোট প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি (৯৪.৯ মিলিয়ন কেজি) চা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলা থেকেই উৎপাদিত হয়েছে ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার কেজির বেশি প্রক্রিয়াজাত চা। এটি কেবল লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে তাই নয়, বরং ২০০০ সালে এই অঞ্চলে চা চাষ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালে এই অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল, যা সে সময় জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ ছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদনে এই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি উত্তরাঞ্চলে চা শিল্পের দ্রুত বিকাশেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
| বিষয় | পরিমাণ |
|---|---|
| দেশে মোট চা উৎপাদন | প্রায় ৯৪.৯ মিলিয়ন কেজি |
| উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার উৎপাদন | প্রায় ২০.২৪ মিলিয়ন কেজি |
| জাতীয় উৎপাদনে অংশ | প্রায় ২১% |
| আগের রেকর্ড (২০২৩) | ১৭.৯৫ মিলিয়ন কেজি |
বর্তমানে এই পাঁচ জেলায় চা শিল্পের বিস্তারও উল্লেখযোগ্য। ২৫ একরের বেশি আয়তনের ১২টি নিবন্ধিত এবং ১৮টি অনিবন্ধিত বড় চা বাগান রয়েছে। পাশাপাশি ২৫ একরের কম আয়তনের ২,২২৫টি নিবন্ধিত এবং ৬,১৪৬টি অনিবন্ধিত ছোট বাগান রয়েছে। এসব বাগান স্থানীয় কৃষকদের আয়ের নতুন উৎস তৈরি করেছে।
| জেলা | আবাদি জমি (একর) |
|---|---|
| পঞ্চগড় | ৯,৮১৯.৭৩ |
| ঠাকুরগাঁও | ১,৪৫৭ |
| লালমনিরহাট | ১২৪.৮২ |
| দিনাজপুর | ১৩০ |
| নীলফামারী | ৬৭.৯২ |
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৩ একর বেশি জমিতে চা চাষ হয়েছে। বর্তমানে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৬০০ একরে পৌঁছেছে।
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। কয়েক বছর আগে চা চাষে লোকসানের কারণে অনেক কৃষক হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ২০২৩ সালে প্রায় ১২ হাজার ১৩২ একর জমিতে চা চাষ হলেও কাঁচা পাতার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েন। ফলে ২০২৪ সালে চা চাষের জমি কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫২৭ একরে। অনেক কৃষক তখন তাদের বাগান উপড়ে ফেলতেও বাধ্য হন।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে চা বোর্ড দেখতে পায়, অনেক কৃষক অনুমোদিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছিলেন। মৌসুমে যেখানে তিনবার সার প্রয়োগের কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে সাত থেকে আটবার সার দেওয়া হচ্ছিল। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে কিছু কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনীয় ধাপ ঠিকমতো অনুসরণ করা হচ্ছিল না।
বিশেষ করে ‘উইদারিং’ বা চা পাতা শুকানোর প্রাথমিক ধাপ অনেক জায়গায় এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ফলে কারখানার যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় চালাতে হতো—প্রতিদিন ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। পরে সঠিক পদ্ধতিতে এই ধাপ অনুসরণ শুরু করলে একই পরিমাণ চা প্রক্রিয়াজাত করতে মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ কমেছে এবং চায়ের মানও উন্নত হয়েছে।
চা শিল্পে নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়েছে মূলত দাম বৃদ্ধির কারণে। পঞ্চগড়ে নিলামে ২০২৫ সালে প্রক্রিয়াজাত চায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ২৪২ টাকা, যেখানে ২০২৪ সালে তা ছিল ১৬২ টাকা।
একই সঙ্গে কাঁচা চা পাতার দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০২৪ সালে কেজিপ্রতি সরকারি দাম ছিল ১৮ টাকা, কিন্তু বাজারে তা নেমে গিয়েছিল ৮ থেকে ১০ টাকায়। ২০২৫ সালে চাহিদা বাড়ার কারণে চাষিরা কাঁচা পাতা বিক্রি করতে পেরেছেন কেজিপ্রতি প্রায় ৩৮ টাকা পর্যন্ত দামে।
চা শিল্পের বিকাশে অবকাঠামোগত উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র চালু হয়, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে মোট ৫২টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি পঞ্চগড়ে এবং একটি ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থিত।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রোসেয়া গ্রামের কৃষক হুমায়ুন খালেদ প্রায় দেড় একর জমিতে চা চাষ করেন। টানা তিন বছর লোকসানের পর সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে তিনি প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ করেছেন।
তিনি বলেন, হতাশ হয়ে একসময় বাগানের যত্ন নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতির উন্নতি দেখে তিনি আবার নতুন করে বাগান পরিচর্যার পরিকল্পনা করছেন। তার আশা, ভবিষ্যতে এই জমি থেকেই বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব হবে।
উত্তরাঞ্চলে চা শিল্পের এই উত্থান শুধু কৃষকদের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।