খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে মাঘ ১৪৩২ | ২৯ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত এক নতুন রূপ নিচ্ছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন ও সেবায় এআইয়ের আর্থিক অবদান ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। এই বিপুল পরিবর্তন উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করছে। প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়লে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়—বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশের জন্য এআই এখন আর কোনো ভবিষ্যতবাদী ধারণা নয়; এটি সরাসরি উৎপাদনশীলতা, সেবা ব্যবস্থার মান এবং রাষ্ট্রীয় দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত। প্রশ্ন হলো, এআই কি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবে—এই উত্তর নির্ভর করছে ডেটা, অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও নীতিগত প্রস্তুতির ওপর।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও বড় মাত্রায় শ্রমঘন খাতনির্ভর। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হলেও উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম। এআই এখানে দ্বিমুখী সুবিধা দিতে পারে—একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, অন্যদিকে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেই বেশি ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করা। গবেষণা বলছে, এআই প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারি সেবায় সময় ও ব্যয় ২০–৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। কৃষি খাতে রোগ শনাক্তকরণ ও ফলন পূর্বাভাসে ক্ষতি ১০–১৫ শতাংশ কমতে পারে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে জালিয়াতি শনাক্তকরণে দক্ষতা বাড়তে পারে ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ ডেটায় সমৃদ্ধ। ১৮ কোটির বেশি জাতীয় পরিচয়পত্র রেকর্ড, ১৭ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ, ৭ কোটির বেশি মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহারকারী এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার কোটি কোটি রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু এআইয়ের জন্য প্রয়োজন যে মানসম্পন্ন, সমন্বিত ও হালনাগাদ ডেটা—সেটির ঘাটতি স্পষ্ট।
ডেটা প্রস্তুতির তিনটি বড় সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, বিচ্ছিন্নতা—সরকারি ডেটার বড় অংশ এখনো দপ্তরভিত্তিক সাইলোতে বন্দী, যেখানে এক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অন্য মন্ত্রণালয় সহজে ব্যবহার করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, মান ও হালনাগাদের ঘাটতি—অনেক ডেটাসেট নিয়মিত আপডেট না হওয়ায় এআই মডেলের পূর্বাভাস নির্ভুল হয় না। তৃতীয়ত, ডেটা গভর্ন্যান্স—ডেটা ব্যবহারের স্পষ্ট আইনি কাঠামো ও নীতিমালা না থাকলে এআই প্রয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এআই উন্নয়নের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশ হলো কম্পিউটিং। একটি মাঝারি মানের এআই মডেল প্রশিক্ষণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জিপিইউ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কুলিং ব্যবস্থা এবং স্কেলযোগ্য ক্লাউড অবকাঠামো প্রয়োজন। বাংলাদেশে জাতীয় ডেটা সেন্টার ও কিছু বেসরকারি ডেটা সেন্টার থাকলেও এআই-গ্রেড জিপিইউ সক্ষমতা এখনও সীমিত। ফলে বড় প্রকল্পে বিদেশি ক্লাউডের ওপর নির্ভরতা বেশি, যা খরচ বাড়ায় এবং ডেটা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তোলে।
প্রতি বছর বাংলাদেশে ২০–২৫ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি স্নাতক পাস করেন এবং হাজারের বেশি স্টার্টআপ সক্রিয়। তবু বাস্তব সমস্যাভিত্তিক দক্ষ এআই প্রকৌশলীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় ৪–৫ গুণ কম। পাশাপাশি এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় এআই নীতি, সরকারি ব্যবহারে নৈতিক নির্দেশনা ও কার্যকর ডেটা সুরক্ষা কাঠামো অনুপস্থিত।
কৃষি, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিবহন—এই খাতগুলোতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগেই দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের দক্ষতা ২৫–৩০ শতাংশ বাড়ানো এবং নগরে যানজটের সময় ১৫–২০ শতাংশ কমানো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
| ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | মূল চ্যালেঞ্জ |
|---|---|---|
| ডেটা | বিপুল পরিমাণ | সমন্বয় ও মান |
| কম্পিউটিং | সীমিত | উচ্চ ব্যয় |
| মানবসম্পদ | সংখ্যায় বেশি | দক্ষতার ঘাটতি |
| নীতি | আংশিক | পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর অভাব |
সংখ্যাই এখানে সবচেয়ে বড় গল্প বলে। বাংলাদেশে এআইয়ের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু প্রস্তুতির ঘাটতিও স্পষ্ট। সুযোগের জানালা এখনো খোলা—তবে কৌশল, বিনিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্তে দেরি হলে এই জানালা দ্রুতই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।