লালমনিরহাটের পাটগ্রামের মো. মিঠু আলমের জীবন শুরু হয়েছিল অনেকটা কঠিন পরিস্থিতি থেকে। একসময় তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সেখানে কাজের অমানুষিক পরিশ্রমের কারণে শরীরে ব্যথা অনুভব করতেন এবং অবশেষে মা’র আহ্বানে বাড়ি ফিরে আসেন। তবে, পরবর্তী সময়ে তার জীবন মোড় নেয় নতুন এক দিশায়। অনেক ঘাত–প্রতিঘাত পেরিয়ে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকে অফিসার (ক্যাশ) পদে চাকরি করছেন তিনি।
মিঠু আলম বলেন, ‘পোশাক কারখানায় অমানুষিক পরিশ্রম করার সময় বুঝেছিলাম, পড়াশোনা একটা সহজ কাজ। কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে বাড়ি চলে আসি। আমার দুলাভাই পরামর্শ দেন স্নাতকে ভর্তি হওয়ার। তখন ভর্তির সময় প্রায় শেষ। কারমাইকেল কলেজে ফরম তুলে পরীক্ষা দিয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাই। ভর্তি হওয়ার পর কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়নরত আমার এক চাচার কাছ থেকে প্রথম শুনতে পারি, পড়াশোনা করলে ঘুষ ছাড়াও চাকরি হয়। চাকরির জন্য ঘুষ দিতে হয়, এ জন্য কখনো চাকরির চেষ্টা করার কথা ভাবিনি। কারণ, ঘুষ দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। কিন্তু ঘুষ ছাড়াও চাকরি হওয়ার কথা শুনে ব্যাংকে চাকরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।’
এসএসসিতে মানবিক থেকে ৩.৩৮ জিপিএ এবং এইচএসসিতে ৪ জিপিএ পান মিঠু আলম। আগে থেকে পড়াশোনায় ঘাটতি থাকায় চাকরির প্রস্তুতির শুরুতে হোঁচট খান। মিঠু আলম বলেন, ‘আমার বেসিক ভালো ছিল না। তাই আমাকে একদম শুরু থেকেই সব প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। ক্লাস ছাড়া সব সময়ই পড়াশোনার মধ্যে থাকতাম। মনের মধ্যে একটা জেদ ছিল, সফল হতে হবে।’
ইংরেজি শেখার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত থেকে উপকৃত হয়েছেন মিঠু আলম। তিনি বলেন, ‘ইংরেজি শেখাটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার ভোকাবুলারি নোট করেছিলাম। ইংরেজি শেখা শেষে ব্যাংকের চাকরির জন্য অন্যান্য বিষয় সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা শুরু করি। সব বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া কষ্টকর ছিল। কিন্তু আমি থেমে যাইনি।’
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর মিঠু আলম ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সিনিয়র অফিসার পদে পরীক্ষা দেন, কিন্তু প্রথমবারেই সফল হননি। তবে তিনি হতাশ হননি এবং আরও বেশি পরিশ্রম করে আবারো আবেদন করেন। এবার তিনি আটটি ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন, তার মধ্যে দুটি পরীক্ষায় সফল হন— একটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসার (ক্যাশ) পদ এবং অন্যটি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাইভা পরীক্ষার সময়, তার আশপাশের প্রার্থীদের দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে যান। মিঠু আলম বলেন, ‘ভাইভার আগে সব প্রার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও রেজাল্ট বলে। আমার পাশে বসা স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ও ভালো রেজাল্টধারী প্রার্থীদের দেখে আমার মনে হয়েছিল, আমার চাকরিটা হবে না। আত্মবিশ্বাস একটু কমে গেলেও প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল না। ভাইভা ভালো হয়েছিল। পরীক্ষার চূড়ান্ত রেজাল্ট পেয়ে খুশিতে কান্না চলে এসেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরির স্বপ্ন হয়তো অনেকের কাছে কিছু না, কিন্তু আমি যে অবস্থা থেকে উঠে এসেছি, এটা আমার জন্য জীবনের বড় পাওয়া।
মিঠু আলমের পরামর্শ, যারা চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য— ‘প্রতিযোগিতা অনেক, এবং সফল হতে হলে আপনাকে অন্যদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হবে। আপনার প্রস্তুতি যদি অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়, তখন আপনি নিজেকে ১৫০ জনের মধ্যে জায়গা পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করবেন।’
মিঠু আলমের গল্প প্রমাণ করে যে, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে পথ চললে যে কোনো কঠিন লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
খবরওয়ালা/এসআর



