টানা ২৫ দিন ধরে চলা চরম গ্যাস-সংকটের মধ্যে আশার আলো দেখা গেলেও তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। গত শনিবার সামিট গ্রুপের ভাসমান টার্মিনালটি পুরোদমে এবং মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি আংশিক সচল হওয়ায় সরবরাহে কিছুটা গতি এসেছিল। তবে নতুন এলএনজি কার্গো না থাকায় গত তিন দিন ধরে এক্সিলারেট থেকে গ্যাসের সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। শেষ পর্যন্ত আজ বুধবার বেলা তিনটার দিকে টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সারা দেশে জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তদারকিতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা আমদানিকৃত এলএনজি ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করে। আমদানির মূল দায়িত্ব পালন করে পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়মিত আন্তর্জাতিক দরপত্রের বাইরে গিয়ে অপেক্ষাকৃত কম দামে দ্রুত এলএনজি পেতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিইপিএমটিআর) কয়েকটি কার্গোর ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। চলতি মাসেই সেখান থেকে অন্তত চারটি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও একটিও সময়মতো আসেনি। আর এই শিডিউল বিপর্যয়ের কারণেই মূলত সংকট মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এখন মহেশখালীতে রিগ্যাসফিকেশনের জন্য টার্মিনাল প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও এলএনজির অভাবে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে আমদানি করা এলএনজি পুনর্নবীকরণ ও সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করার জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটির দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিট টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই এক ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ মেরামত শেষে গত শনিবার তারা পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু আমদানিকৃত কার্গো এসে না পৌঁছানোয় তারা শুধু পুরোনো মজুত থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু করতে পেরেছিল। সেই সীমিত মজুতও সোমবার থেকে কমতে কমতে আজ পুরোপুরি শূন্য হয়ে পড়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের সামগ্রিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এর বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে অন্তত ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট আসে এলএনজি আমদানি থেকে। কিন্তু দুটি টার্মিনালে সংকট তৈরি হওয়ায় গত শুক্রবার দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে দৈনিক ১৬৪ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। পরে সামিট ৯ কোটি ঘনফুট দিয়ে সরবরাহ শুরু করার পর শনিবার ভোরে মোট সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪২ কোটি ঘনফুটে। এরপর রোববার ২৪০ কোটি এবং সোমবার ২২৮ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। আজ এক্সিলারেটের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ২১৮ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। কেবল এলএনজি খাতের হিসাব করলে, গতকাল যেখানে ৬৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেওয়া হয়েছিল, আজ তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৫ কোটি ঘনফুটে।
হঠাৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট, টেক্সটাইল, সার কারখানা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদনের গতি মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শহরের বাসাবাড়িতে গৃহস্থালি রান্নাবান্না ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে চাপ কমে গেছে।
পরিস্থিতি উত্তরণে অবশ্য নতুন কার্গো আসার অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার একটি এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, যা সামিটের টার্মিনালে ভিড়তে পারে। অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া এক্সিলারেটের জন্য নতুন কার্গো ২৩ থেকে ২৪ আগস্টের আগে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। ফলে আগামী কয়েক দিন এক্সিলারেটের টার্মিনাল সম্পূর্ণ অচল থাকবে এবং এই সময়জুড়ে সারা দেশে গ্যাসের চরম সংকট বহাল থাকবে।

