খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইরানে গত কয়েক দিনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রত্যাশিত দ্রুত সাফল্য না আসায় এখন ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের পথে হাঁটছে ওয়াশিংটন। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি এবং স্থল অভিযান জোরদার করতে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্রোহী কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহারের একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) ইতোমধ্যে এসব কুর্দি সংগঠনের হাতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও অর্থ পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
ইরান-ইরাক সীমান্ত এলাকায় বর্তমানে হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যাদের মূল ঘাঁটি ইরাকের স্বশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও জাতিগত বিরোধের জেরে এই গোষ্ঠীগুলো তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ঘোর বিরোধী। গত শনিবার শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সামরিক অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগকে কাজে লাগাতে চায় ওয়াশিংটন। সিআইএ-র পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুর্দিরা ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে, যাতে রাজধানী তেহরানসহ অন্যান্য প্রধান শহরগুলোতে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান ঘটানো সহজ হয়।
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও কৌশল |
| মূল লক্ষ্য | ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে দুর্বল করা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ উসকে দেওয়া। |
| সহায়তাকারী সংস্থা | মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ)। |
| কৌশলগত অবস্থান | ইরাকের ইরবিল ও সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চল। |
| রাজনৈতিক যোগাযোগ | প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কুর্দি নেতা মুস্তফা হিজরির মধ্যে সরাসরি সংলাপ। |
| সম্ভাব্য ফলাফল | ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে গৃহযুদ্ধ সদৃশ পরিস্থিতির সৃষ্টি। |
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের কুর্দিস্তান গণতান্ত্রিক দলের (কেডিপিআই) সভাপতি মুস্তফা হিজরির সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি ইরাকি কুর্দিস্তানের রাজধানী ইরবিলের নেতাদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে হোয়াইট হাউস। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ইরবিলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং কুর্দি যোদ্ধাদের রসদ সরবরাহের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরে কুর্দিদের মাধ্যমে প্রথম বড় ধরনের স্থল হামলা পরিচালিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে কুর্দিদের এই সশস্ত্র উত্থান দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলী বালুচ সংখ্যালঘুদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে। যদি বালুচ গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, তবে তার প্রভাব সরাসরি পাকিস্তানে পড়বে, যা ইসলামাবাদ কখনোই মেনে নেবে না।
অন্যদিকে, তুরস্কের সঙ্গে কুর্দিদের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক রয়েছে। আঙ্কারা তাদের সীমান্তের কাছে কোনো সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীর শক্তিশালী অবস্থানকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। ফলে ওয়াশিংটনের এই নতুন ‘কুর্দি চাল’ কেবল ইরান নয়, বরং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ দিনের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল এখনও সরাসরি কোনো স্থল বাহিনী ইরানে পাঠায়নি। কুর্দিদের ব্যবহার করে এই ঘাটতি পূরণ করা একদিকে যেমন মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি কমাবে, অন্যদিকে এটি ইরানকে দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি নীল নকশা হতে পারে। তবে ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) ইতোমধ্যে কুর্দি ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত এই অসম লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ।