খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৪ আগস্ট ২০২৫
“ভবের খেয়া এবার বাওয়া হইল আমার শেষ; এবার তরী ভাসিয়ে দিলাম পরপারের দেশ।”
বাংলা সঙ্গীত জগতের আদি ও প্রবাদপুরুষ, কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, থিয়েটার ও চলচ্চিত্র অভিনেতা এবং সঙ্গীত পরিচালক কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনিই ছিলেন শচীন দেব বর্মণের প্রথম সঙ্গীত গুরু এবং মান্না দে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র।
শৈশব ও অন্ধত্ব
১৮৯৩ সালের ২৪ আগস্ট, জন্মাষ্টমীর দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণচন্দ্র। বাবা শিবচন্দ্র দে ও মা রত্নমালা দেবী ছেলের নাম রাখেন শ্রীকৃষ্ণের নামে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর সঙ্গীতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে ১৩ বছর বয়সে আকস্মিক মাথার যন্ত্রণার কারণে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারান এবং সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন সংগ্রাম।
সঙ্গীত শিক্ষা
অন্ধত্ব তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি সঙ্গীত শেখেন শশীভূষণ চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ বাদল খান, দানী বাবু, রাধারমণ ও কণ্ঠে মহারাজের কাছে। খেয়াল, ধ্রুপদ, কীর্তন, তবলা— সর্বত্রই ছিল তাঁর দক্ষতা।
সঙ্গীতে প্রথম সাফল্য
১৯১৭ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। কয়েক বছরের সাধনার পর তিনি প্রবেশ করেন নাটকের জগতে— শিশির ভাদুড়ির থিয়েটারে। গান ও অভিনয়ে একের পর এক সাফল্য তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে।
১৯৩১ সালে তিনি নিজের থিয়েটার কোম্পানি গড়ে তোলেন এবং সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি নাট্যপ্রযোজনাতেও সাফল্য পান। এর মাঝেই শুরু হয় চলচ্চিত্র যুগ।
চলচ্চিত্র জীবন
১৯৩২ সালে ‘চণ্ডীদাস’ ছবিতে অভিনয় ও কণ্ঠদানের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সিনেমায় এক ঐতিহাসিক অধ্যায় রচনা করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে অভিনেতা, গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেন।
১৯৪২ সালে তিনি মুম্বইতে স্থায়ী হন এবং হিন্দি সিনেমায় অভিনয়, গান ও সঙ্গীত পরিচালনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর গানগুলো লোকসঙ্গীত, কীর্তন, বাউল ও ভাটিয়ালির প্রভাবমণ্ডিত হওয়ায় সহজেই মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেত। উর্দু গজলেও তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলা গানে ঠুমরি, দাদরা ও গজলের প্রচলন ঘটে।
সৃজন ও অবদান
তাঁর গানের কথা লিখেছেন হেমেন্দ্রকুমার রায়, শৈলেন রায়, অজয় ভট্টাচার্য, এমনকি রবীন্দ্রনাথও। সুরারোপ করতেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি নিজেই।
১৯৪৭ সালে তিনি আবার বাংলায় ফিরে আসেন এবং গায়ক, অভিনেতা, প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৭ সালে ‘একতারা’ ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে তাঁর শেষ অভিনয়টি দর্শক দেখেন।
ব্যক্তিগত জীবন
যদিও সবাই তাঁকে অবিবাহিত মনে করতেন, বাস্তবে তিনি গোপনে সহঅভিনেত্রী তারকবালাকে (মিস লাইট) শাস্ত্র মতে বিবাহ করেছিলেন। বিয়ের পর তাঁর নাম হয় রমা দে। তাঁদের একমাত্র সন্তান অকালমৃত্যুবরণ করলে কৃষ্ণচন্দ্র মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মৃত্যুশয্যায় তিনি আত্মীয়দের অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁর অবর্তমানে রমার যত্ন নেওয়া হয়। কৃষ্ণচন্দ্রর মৃত্যুর পর রমা দে নিভৃত ও নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নেন।
পরিণতি
১৯৬২ সালের ২৮ নভেম্বর কলকাতায় কৃষ্ণচন্দ্র দে চিরবিদায় নেন।
অন্ধত্বের অন্ধকার তাঁর দৃষ্টি কেড়ে নিলেও, তাঁর প্রতিভা বাংলা সঙ্গীত ও সংস্কৃতির আকাশকে চিরদিন আলোকিত করে রেখেছে।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এফএস