খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক বোঝা প্রতিনিয়ত আরও তীব্র ও অসহনীয় হয়ে উঠছে। দেশের বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, শহরাঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষার অতিরিক্ত চাহিদা এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দ্রুত প্রসার—এই তিনটি মূল কারণে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষা ব্যয়ের সিংহভাগ অংশ সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকেই বহন করতে হয়, যা তাদের সঞ্চয় ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনেস্কোর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষা খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের অংশ পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে অনেক পরিবারকে তাদের মোট মাসিক বা বার্ষিক আয়ের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ শুধুমাত্র সন্তানের শিক্ষার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। শহরাঞ্চলে এই ব্যয়ের চাপ আরও বেশি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। গত এক দশকে পরিবারের মোট ব্যয়ের মধ্যে শিক্ষা খাতের অংশ প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতে যেখানে পরিবারের মোট খরচের মাত্র ৬ থেকে ৮ শতাংশ শিক্ষার পেছনে ব্যয় হতো, বর্তমানে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে তা ১২ থেকে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষা খাতের ব্যয়, বৈষম্য এবং বীমা খাতের তুলনামূলক চিত্র নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| শিক্ষা ও বীমা খাতের প্রধান সূচকসমূহ | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিবরণ |
| পরিবার কর্তৃক বাহিত শিক্ষা ব্যয়ের হার | দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মোট শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৭১ শতাংশ |
| শিক্ষার পেছনে পরিবারের আয়ের ব্যয়ের অংশ | অনেক পরিবারের মোট аয়ের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যয় হয় |
| এক দশকে শিক্ষা ব্যয়ের আনুপাতিক বৃদ্ধি | পরিবারের মোট ব্যয়ের ৬ থেকে ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ |
| সামগ্রিক বার্ষিক মূল্যস্ফীতির গড় হার | দেশের বর্তমান অর্থনীতিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে |
| শিক্ষা খাতে সুনির্দিষ্ট ব্যয় বৃদ্ধির হার | বাস্তব আয় বৃদ্ধির তুলনায় শিক্ষা খাতে ব্যয়ের বৃদ্ধির হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ |
| ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের মাসিক আনুমানিক খরচ | ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে প্রতি মাসে ১৫,০০০ থেকে ৯০,০০০ টাকার বেশি |
| বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক খরচ | প্রতি বছরে ন্যূনতম ২,০০,০০০ থেকে ৮,০০,০০০ টাকা বা তার বেশি |
| জিডিপিতে বাংলাদেশের বীমা খাতের অবদান | মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ০.৪ থেকে ০.৫ শতাংশের মধ্যে |
| বিশ্বব্যাপী বীমা খাতের অবদানের গড় হার | বিশ্বব্যাপী মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) গড় হার ৬ শতাংশের বেশি |
| মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার | আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩০ শতাংশ |
ইউনেস্কোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন এবং বিশ্বব্যাংকের শিক্ষা খাত সংক্রান্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মোট শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৭১ শতাংশ পর্যন্ত পরিবারগুলোকে নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করতে হয়। এই উচ্চ ব্যক্তিগত ব্যয় শিক্ষা খাতে সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বর্তমানে সামগ্রিক বার্ষিক মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, সেখানে শিক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। ফলে বাস্তব আয় বৃদ্ধির তুলনায় শিক্ষা ব্যয় দ্রুত বাড়ায় পরিবারগুলোর সঞ্চয় কমছে এবং ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
এই জটিল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সন্তানের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ‘শিক্ষা বীমা’ একটি কার্যকর আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি মূলত এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা, যেখানে অভিভাবক নির্দিষ্ট সময় অন্তর নিয়মিত কিস্তি বা প্রিমিয়াম জমা দিয়ে ভবিষ্যতে সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট তহবিল গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে যদি কোনো কারণে পলিসি চলাকালীন অভিভাবকের আকস্মিক মৃত্যু বা স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা ঘটে, তবে অনেক ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি বাকি কিস্তি মওকুফ করে দেয় এবং নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী অর্থ প্রদান অব্যাহত রাখে। ফলে সন্তানের শিক্ষাজীবন মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েকটি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান এই বিশেষ সেবা প্রদান করছে। এর মধ্যে মেটলাইফ বাংলাদেশ তাদের একটি বিশেষ শিক্ষা সুরক্ষা পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এবং গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই খাতে সক্রিয় রয়েছে, যা ধীরে ধীরে বাজারে প্রতিযোগিতা ও সেবার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করছে। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশে শিক্ষা বীমার ব্যবহার এখনো অত্যন্ত সীমিত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ Authorities বা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বীমা খাতের অবদান জিডিপির মাত্র ০.৪ থেকে ০.৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে বিশ্ব গড় ৬ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে, শিক্ষা ব্যয়ের বাস্তব চিত্র প্রতিনিয়ত আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে মাসিক খরচ ১৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার বেশি হওয়া এখন একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে ভর্তি ফি, বই, পরিবহন ও কোচিং খরচ যুক্ত হলে মোট ব্যয় আরও ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। backpacking একইভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে ২ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকা খরচ হওয়া এখন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ান Desenvolvimento বা ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উচ্চ ব্যয় ভবিষ্যতে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবারকে জরুরি খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে বা চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। হঠাৎ পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তি মারা গেলে বা অক্ষম হয়ে পড়লে সন্তানের শিক্ষাজীবন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক সংকটই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ এবং বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থনীতিবিদ ও বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা বীমা শুধু একটি সাধারণ আর্থিক পণ্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি অন্যতম কৌশলগত বিনিয়োগ। এটি পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং যেকোনো অনিশ্চয়তার সময়েও সন্তানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত রাখে। তবে এর বিস্তার দেশব্যাপী বৃদ্ধি করতে হলে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি, সহজ ও স্বল্পমূল্যের পলিসি তৈরি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষা ব্যয় যত বাড়ছে, শিক্ষা বীমার প্রয়োজনীয়তাও ঠিক ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে।