মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: বুধবার, ৬ আগস্ট ২০২৫
প্রবাদ আছে, ‘বাঁশ বনে ডোম কানা’ ডোম যখন বাঁশ বনে যায় তখন তার সামনে যে বাঁশ চোখে পড়ে সেটাই তার কাটতে ইচ্ছে করে। শেষে নীরস অপরিপক্ব বাঁশ কেটে বাড়ি ফিরে। কবিগুরু সম্পর্কে কিছু বলতে বা লিখতে গেলে আমারও ডোমের মতো অবস্থা হয়ে যায়।
এবার স্থির করলাম কবিগুরুর ‘গোরা’ উপন্যাস নিয়ে দুটি কথা লিখি। প্রকৃতপক্ষে গোরা চরিত্রটি কবিগুরুরই মানস চরিত্র। যেখানে তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভেদাবেদকে তুচ্ছ করে আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে সকল মানুষকে সমান করে দেখিয়েছেন। গোরা যখন জানতে পারলেন তিনি আইরিশ দম্পতির সন্তান তখন তিনি পরেশবাবুকে বললেন,
‘আজ আমি ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান কোন সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকলের জাতই আমার জাত,সকলের অন্নই আমার অন্ন।’
রবীন্দ্রনাথ নিজে হিন্দু-ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও ব্রাহ্মসমাজের সদস্য ছিলেন। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণকে বড় না করে বিশ্বমানবধর্ম এবং মানবিকতাকে বড় করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, চড়ঘোষপুরে হিন্দুনাপিত এক মুসলিম সন্তানকে লালন-পালন করছে। কবিগুরুর মতে এটাই আমাদের জাতীয়তাবাদের প্রকৃতি হওয়া উচিত। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুধু ব্রাহ্মণ বা হিন্দুধর্মের আন্দোলন নয়,সমগ্র জনসমাজের আন্দোলন।
যে কারণে তিনি লিখেছেন, ‘স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আমাদের ঘরের কাছে পড়িয়া আছে-কেহ তাহা কাড়ে নাই এবং কোনদিন কাড়িতে পারেও না। আমাদের গ্রামের, আমাদের পল্লীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পথ-ঘাটের উন্নতি, সমস্তই আমরা নিজে করিতে পারি-যদি ইচ্ছা করি, যদি এক হই। এজন্য গবর্মেন্টের চাপরাস বুকে বাঁধিবার কোন দরকার নাই। কিন্তু ইচ্ছা যে করে না, এক যে হই না। তবে চুলোয় যাক স্বায়ত্তশাসন। তবে দড়ি ও কলসির চেয়ে বন্ধু আমাদের আর কেহ নাই।’
‘গোরা’ উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা, ১৩১৬বঙ্গাব্দে (ইংরেজি,১৯১০খ্রিস্টাব্দ)। উনিশ শতকের শেষভাগে এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট রচনা করেছে। এই সময়ে ভারতবর্ষ তথা বাংলায় ব্রাহ্মসমাজ ও হিন্দুসমাজের আন্দোলন, স্বদেশপ্রেম ও নারীমুক্তি আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সামাজিক স্বীকৃতির আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। এই সমস্ত আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘গোরা’ উপন্যাসটি ওঠে এসেছিল। ‘গোরা’ উপন্যাসে এক বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসার এক প্রচণ্ড আবেগ লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ স্বদেশ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশকে সম্পূর্ণভাবে কেউই কেড়ে নিতে পারে না, এবং সেই দেশকে বাইরে থেকে দয়া করে কেউ আমাদের হাতে তুলে দেবে এমন শক্তি কারো নেই। দেশের পরে নিজের স্বাভাবিক অধিকারকে যে পরিমাণে আমরা ত্যাগ করেছি সেই পরিমাণে অন্যে তাকে অধিকার করেছে। পাশ্চাত্য রাজার শাসনে এইখানে ভারতবর্ষ আঘাত পেয়েছে। গ্রামে গ্রামে তার যে সামাজিক স্বরাজ পরিব্যাপ্ত ছিল রাজশাসনে তাকে অধিকার করলে।’
গোরা উপন্যাসের সমগ্র পটভূমিকা হল যখন কলকাতায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত ছিল। সমাজ তখন দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। একদিকে ছিল হিন্দুসমাজের রীতি-নীতি, মূর্তিপূজা, জাতের বিচার। এবং অন্যদিকে ছিল ব্রাহ্মসমাজ, যাঁরা হিন্দুসমাজের নেতিবাচক দিক গুলিকে খণ্ডন করে ইংরেজি শাসন ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলি নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
আজও আমরা জাতি-বিদ্বেষ কেন্দ্রীক চিন্তাধারার থেকে সরে এসে খুব কম ক্ষেত্রেই উন্নয়নের কথা ভাবি। আজও অনেক সমাজ ও সম্প্রদায় রয়েছে যারা জাতিপ্রথার নামে মানুষের মানবিকতাকে অস্বীকার করে। যেকারণে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসে বিশ্বমানবতাকে গুরুত্ব দিয়ে জাতিপ্রথার উর্ধ্বে ওঠার কথা বলেছেন। তাই বর্তমান সমাজ ও রাজনীতিতে ‘গোরা’উপন্যাসটির প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব রয়েছে।
‘গোরা’র মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের হিন্দুত্ববাদী সংস্কার থেকে বিশ্বমানবতায় উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতীক হিসেবে তিনি ‘গোরা’ চরিত্রটিকে সৃষ্টি করেছেন।প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ গোরা চরিত্রটির মধ্যদিয়ে তৎকালীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতাদের শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রকৃতি কেমন হওয়া উচিত!
এই উপন্যাসের এক একটি চরিত্রকে তিনি আমাদের ভারতবর্ষীয় সমাজের এক একটি দিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। জাতীয়তাবাদ শব্দটি যে কেবলমাত্র হিন্দুত্বের আতিশয্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি মানুষের ঐক্যবদ্ধতাই যে জাতি গঠনের মূল উপাদান তা তিনি এই উপন্যাসের প্রত্যেকটি ঘটনা ও চরিত্র গুলির মধ্যদিয়ে বর্ণনা করেছেন।
তিনি মনে করতেন যে বিদেশি শক্তির আগ্রাসী মনোভাব ভারতবর্ষের পরাধীনতার জন্য যত না দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের দেশের প্রতি নিজেদের কর্তব্য-কর্ম ও সেবার অভাব দায়ী। যে কারণে তিনি প্রকৃত স্বরাজের অর্থ উন্মোচন করতে গিয়ে লিখেছেন,
‘যে দেশাত্মবোধী বলে, আগে স্বরাজ পেলে তার পরে স্বদেশের কাজ করব, তার লোভ পতাকা-ওড়ানো উর্দি-পরা স্বরাজের রং করা কাঠামোটার’ পরেই…স্বরাজ আগে আসবে, স্বদেশ সাধনা তার পরে, এমন কথাও তেমনিই সত্যহীন, এবং ভিত্তিহীন এমন স্বরাজ।’
এই উপন্যাসে দেখা যায় যে হিন্দু-ব্রাহ্মণ পরিবারে লালিত-পালিত হওয়ার ফলে গোরার মধ্যে হিন্দুধর্মের কুসংস্কার,গোঁড়ামি পরিপূর্ণ ছিল। সে বিশ্বাস করতো যে হিন্দুধর্মের ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে এক সুন্দর,সুগঠিত ভারতবর্ষ গড়ে উঠবে। কিন্তু কলকাতা শহর ছেড়ে চড়ঘোষপুরে গিয়ে সে স্বদেশের আসল চেহারা দেখতে পায়।সেখানে ইংরেজদের অপশাসন,গ্রামের মানুষের দুর্দশা,অজ্ঞতা,কুসংস্কার দেখে সে গ্রামোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। সে বিনয়কে বলে,
‘ভারতবর্ষের সর্বাঙ্গীণ মূর্তিটা সবার কাছে তুলে ধরো-তাহলে লোকে পাগল হয়ে যাবে…প্রাণ দেবার জন্য ঠেলাঠেলি পড়ে যাবে।’
গোরা ছিল অত্যধিক হিন্দু ব্রাহ্মণ্যধর্মের কুসংস্কারে বিশ্বাসী। প্রকৃতপক্ষে হিন্দুধর্মের আচার-আচরণ ও নিয়মের মধ্যে সে ভারতবর্ষকে গুলিয়ে ফেলেছিল।
গোরা যখন কলকাতা শহর ছেড়ে সত্যিকারের গ্রাম্য জীবনকে দেখতে বেরিয়েছে তখন সে বুঝতে পেরেছে যে রেনেসাঁস-এর প্রকৃত ব্যর্থতা হল-শিক্ষিতের সঙ্গে অশিক্ষিতের, গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে শহুরে-মনস্কতার এখনো মিলন হয়নি, আমরা সেই সমস্ত অশিক্ষিত অসহায় মানুষদের সঙ্গে একাত্ম হতে পারিনি। ফলে গোরার বাইরে হিন্দুত্ববাদী সংস্কারের আবরণ থাকলেও অন্তরে সেই সংস্কারের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।
উপন্যাসের এক পর্যায়ে দেখা যায় যে, গোরা ব্রাহ্মসমাজকে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। যেকারণে তার বন্ধু বিনয়েরও ব্রাহ্ম পরেশবাবুর পরিবারে যাতায়াতকে সে ভাল চোখে নেয়নি। এখানেই রয়েছে ব্রাহ্মসমাজ বনাম হিন্দুধর্মের দ্বন্দ্ব।
আধুনিক সভ্যতা বনাম প্রাচীনপন্থী সংস্কারের সংঘাত। গোরা হল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে হিন্দুসমাজের প্রতীক। যারা মনে করত ব্রাহ্মসমাজ হল অত্যন্ত আধুনিক, যারা সমাজের কোন নিয়ম মানে না, যারা ব্রিটিশদের অনুকরণ করে এবং দেশের ঐতিহ্যকে যুক্তিদিয়ে খণ্ডন করে।
জেল থেকে ফিরে এসে গোরা যে প্রায়শ্চিত্ত ও শুদ্ধিকরণ করছে তা আসলে সমগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শুদ্ধিকরণ, হিন্দুত্বের সংস্কার থেকে বিশ্বমানবতায় উত্তরণ। যখন গোরা কৃষ্ণদয়ালের কাছ থেকে নিজের জন্মবৃত্তান্ত জানতে পারছে তখন তার এতদিনের হিন্দুত্ববাদী সংস্কার ভেঙে যাচ্ছে।
আমরা যে ধর্মীয় আত্মবিশ্বাস ও সংস্কার নিয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করছি তা একটা সময় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, যেভাবে গোরার ভেঙে পড়েছে। সে আনন্দময়ীর পায়ে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে এবং বলছে,
‘মা, তুমিই আমার মা। যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসেছিলেন। তোমার জাত নেই,বিচার নেই,ঘৃণা নেই-তুমি শুধু কল্যাণের প্রতিমা।তুমিই আমার ভারতবর্ষ।’
এখানে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ভারতমাতার পায়ে আত্মসমর্পণ করছে, যে ভারতমাতা কোন জাতের বিচার করেন না। যার কাছে সমাজের উচ্চবর্ণ যেমন সন্তান তেমনি পিছিয়ে পড়া নিম্নশ্রেণিও তারই সন্তান।
রবীন্দ্রনাথ ‘গোরা’ উপন্যাসটিতে বারবার বলেছেন, অবশ্যই আমরা দেশের জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করব কিন্তু সেটা যেন কখনোই বিকৃত ভেদাভেদের জাতীয়তাবাদ না হয়। গোরার উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে কবিগুরু জাতীয়তাবাদের বিবর্তন দেখিয়েছেন।
পৃথিবীর কোনো মানুষ, কোনো সমাজ এমনকি কোন দেশই একক ভাবে বাঁচতে পারে না, তাকে অন্যের ওপর নির্ভর করতেই হয়। এখানে এই জাতের বিভাজন অলিক, যার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আনন্দময়ীর মধ্যদিয়ে দেখালেন তিনি হলেন আমাদের ভারতমাতা। যাঁর কাছে জাত-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ নেই। ব্রাহ্মণী হয়েও আনন্দময়ী কোন জাতের বিচার করেননি। তিনি আইরিশ সন্তান গোরাকে কোলে তুলে সমাজের সমস্ত নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন। তিনি খ্রিষ্টান দাসী লছমিয়ার হাতে জল খেতেন। তিনি শুধুই মানবধর্মের ও মানবকল্যাণের প্রতীক। আনন্দময়ী আসলে ভারতমাতার স্বরুপ। যিনি বিনয়কে বলেছেন,
‘মানুষ বস্তুটি যে কত সত্য, আর মানুষ যা নিয়ে দলাদলি করে,ঝগড়া করে মরে তা যে কত মিথ্যে সেকথা ভগবান যেদিন গোরাকে দিয়েছেন সেই দিনই বুঝিয়ে দিয়েছেন। বাবা, ব্রাহ্মণই বা কে, আর হিন্দুই বা কে। মানুষের হৃদয়ের তো কোনো জাত নেই-সেইখানেই ভগবান সকলকে মেলান এবং নিজে এসে মেলেন।’
এই ভারতমাতার মধ্যে কুসংস্কারের বেড়াজাল নেই। তিনি যুক্তিদিয়ে সমস্ত কিছুকে গ্রহণ করেন। যেকারণে তিনি কৃষ্ণদয়ালকে বলেছিলেন,
‘পৃথিবীসুদ্ধ লোক আমাকে খ্রিস্টান বলে-আমি সমস্ত মেনে নিয়েই বলি; তা খ্রিস্টান কি মানুষ নয়! তোমরাই যদি এত উঁচুজাত আর ভগবানের এত আদরের তবে তিনি একবার পাঠানের, একবার মোগলের, একবার খ্রিস্টানের পায়ে এমন করে তোমাদের মাথা মুড়িয়ে দিচ্ছেন কেন?’
প্রকৃতপক্ষে আনন্দময়ী হলেন রবীন্দ্রনাথের প্রতীকী চরিত্র, যার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বিশ্বমাতার ছবি কিরকম হতে পারে। যেকারণে গোরা পরবর্তীকালে বুঝতে পেরেছে যে, হিন্দুত্ব দিয়ে আমাদের দেশ স্বাধীন হবে না। তাই সে ভিতরের সংকীর্ণতাকে ছেড়ে ফেলে বিশ্বমাতার পায়ে আত্মসমর্পণ করছে।
রবীন্দ্রনাথ পানুবাবু ও বড়দাসুন্দরীর মধ্যদিয়ে তথাকথিত শিক্ষিত ব্রাহ্মসমাজের মধ্যেও নানা ধরনের ত্রুটি ও সঙ্কীর্ণতা রয়েছে, যা আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।
যেকারণে চরঘোষপুরে দরিদ্র প্রজাদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে গোরা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে অভিযোগ করলে ব্রাহ্মসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পানুবাবু ভারতবর্ষে ইংরেজদের শাসনকে আশীর্বাদস্বরূপ বলে মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘ইংরাজি বিদ্যার যেটা শ্রেষ্ঠ অংশ সেটা গ্রহণ করিবার অধিকার ইহাদের নাই। ভারতবর্ষে ইংরেজের রাজত্ব যে ঈশ্বরের বিধান এই অকৃতজ্ঞরা এখনো তাহা স্বীকার করিতে চাহিতেছে না।’
বরদাসুন্দরী বিনয়কে হিন্দুসমাজ ত্যাগ করে ব্রাহ্মসমাজের আচার-আচরণ মেনে ললিতাকে বিবাহ করার কথা বলেছিলেন। এখানে ব্রাহ্মসমাজের একদল সদস্যদের মনের সংকীর্ণতাগুলি তুলে ধরেছেন।
ব্রাহ্মসমাজের মধ্যেও নানান সীমাবদ্ধতা ঢুকেছে। যারা পোশাকে কথাবার্তায় অত্যাধুনিক এবং সাধারণ মানুষের থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন, যার অন্যতম প্রতীক হলো বড়দাসুন্দরী এবং পানুবাবু। রবীন্দ্রনাথ এই বিপরীত স্রোতগুলোকে অস্বীকার করেননি। তিনি দেখিয়েছেন যে মানবতাই হলো আসল ধর্ম। যেমন বাইবেলে যীশু বলেছেন,
‘তুমি আগে প্রতিবেশীকে ভালোবাসো’ অর্থাৎ প্রতিবেশীকে ভালোবাসার মধ্যদিয়ে তুমি ধীরে ধীরে উত্তরিত হও বিশ্বমানবতায়।
বিনয় হিন্দুসমাজের অন্তর্ভুক্ত হলেও তার মধ্যে গোরার মতো কোনো সংস্কার বা অন্ধ-গোঁড়ামি ছিল না। সে সকলধর্ম ও সমাজকেই সাদরে গ্রহণ করত,যে কারণে সে ব্রাহ্মসমাজের সদস্য পরেশবাবুর বাড়িতে যাতায়াত করতো। তিনি ছিলেন উদার মনের মানুষ, তাই সে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয়।
বিনয়ের মধ্যেদিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়েছেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এই ভাবেই উদারমনস্কতা, শিক্ষা ও নম্রতা নিয়ে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে,যেখানে কোনো সংকীর্ণতা থাকবে না। যে কারণে তিনি বিনয় চরিত্রটির মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন,
‘আমরা দেশকে বলি মাতৃভূমি,কিন্তু দেশের সেই নারীমূর্তির মহিমা দেশের স্ত্রীলোকের মধ্যে যদি প্রত্যক্ষ না করি…তাহলে কখনোই দেশের উপলদ্ধি আমাদের কাছে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে না।’
সুচরিতা হল ব্রাহ্মসমাজের সদস্য। আসলে তিনি হলেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নারীবাদী কণ্ঠস্বর। যে যুক্তি ও শিক্ষা দিয়ে সমস্ত কিছুকে গ্রহণ করে। যেকারণে সে ভারতবর্ষকে মহান বলে জেনেছে, তার কাছে ভারতবর্ষ হলো এক বিরাট ভক্তিস্থান। যেখানে দেশের সেবাকে সে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনেকরেছে। তাই সে নিজের ভাইকে শিক্ষা দিয়ে বলেছে,
‘একটা খুব বড় দেশে তুই জন্মেছিস…সমস্ত হৃদয় দিয়ে এই বড়দেশকে ভক্তি করবি,আর সমস্ত জীবন দিয়ে এই বড়দেশের কাজ করবি।’
পরেশবাবু নিজে ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হয়েও সকল ধর্ম ও জাতিকে শ্রদ্ধা করতেন। ভারতবর্ষের অগ্রগতিতে এমন মুক্ত ও উচ্চমানের আধুনিকপন্থী মানুষের প্রয়োজন যাঁরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতাদের সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন।যেকারণে তিনি গোরার মধ্যদিয়ে উল্লেখ করেছেন,
‘আপনার কাছেই এই মুক্তির মন্ত্র আছে-আমাকে আপনার শিষ্য করুন।আপনি আমাকে আজ সেই দেবতারই মন্ত্র দিন যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান ব্রাহ্ম সকলেরই-যার মন্দিরের দ্বার কোন জাতির কাছে কোন ব্যক্তির কাছে কোনদিন অবরুদ্ধ হয় না।যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন-যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’
রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘জাতিমিশ্রণ হয় নাই য়ুরোপে এমন দেশ নাই। ইংলাণ্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি কোথাও বিশুদ্ধ জাতি খুঁজিয়া পাওয়া যায় না, এ কথা সকলেই জানেন। রাষ্ট্রনীতিতন্ত্রে জাতিবিশুদ্ধির কোনো খোঁজ রাখে না…নেশন ধর্ম মতের ঐক্যও মানেনা ব্যক্তিবিশেষ ক্যাথলিক,প্রটেস্টান্ট,ইহুদি অথবা নাস্তিক যাহাই হোক না কেন তাহার ইংরেজ, ফরাসি ,জার্মান হইবার কোন বাধা নাই।’
সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে কোন দেশ কখনও সভ্য হতে পারে না। সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে আসতে না পারলে দেশের জন্য কোনো কাজ করা যায় না।
প্রসঙ্গত, আজ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। এই কালজয়ী মনীষীর প্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক, সহ-সম্পাদক, খবরওয়ালা।