রাজধানী ঢাকাজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন বাসাবাড়ির মানুষ। অনেক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে চুলা জ্বালানো যাচ্ছে না। ফলে রান্নার জন্য কেউ বৈদ্যুতিক চুলা, কেউ লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছেন। আর সকালের নাস্তা তৈরি করতে না পেরে অনেকে বাধ্য হয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভিড় করছেন। এতে একদিকে যেমন পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে নিয়মিত বাইরের খাবার খাওয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর বনশ্রীর এফ ব্লকের একটি হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, নাস্তার জন্য বেশ ভিড়। কেউ বসে খাবার খাচ্ছেন, আবার কেউ পার্সেল নিয়ে দ্রুত কর্মস্থলের দিকে ছুটছেন। দোকানের কর্মীদেরও ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়।
হোটেলে নাস্তার অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সেলিম জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তাঁর সকালের খাবার হোটেলেই সারতে হচ্ছে। আগে বাসায় রান্না করেই নাস্তা করতেন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এখন সকালে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, দুপুর ও রাতের খাবারের জন্য বাসায় বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করা হলেও সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়াহুড়োয় সেই ব্যবস্থা করা কঠিন। তাই বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে নাস্তা করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি নিয়মিত বাইরের খাবার খেয়ে পেটের সমস্যাতেও ভুগতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আব্দুল্লাহ নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, আগে প্রতিদিন সকালে বাসায় নাস্তা তৈরি হতো। এখন গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। তবে সকালে সময়ের স্বল্পতার কারণে সেটিও নিয়মিত করা সম্ভব হয় না। ফলে হোটেলই হয়ে উঠেছে বিকল্প ব্যবস্থা।
বনশ্রীর আরেক বাসিন্দা আকবর জানান, তিনি ও তাঁর স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। আগে সকালে রান্না করে খাওয়ার পাশাপাশি দুপুরের খাবারও সঙ্গে নিয়ে অফিসে যেতেন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সেই রুটিন ভেঙে গেছে। এখন সকালে হোটেল থেকে নাস্তা কিনে খেয়ে অফিসে যেতে হচ্ছে এবং রাতে বাসায় ফিরে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
তাঁর হিসাবে, চারটি পরোটা, ডিম ও ডালভাজি কিনতেই প্রায় ১২০ টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে আরও কিছু নিলে ব্যয় ২০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তাঁর ভাষায়, আগে একই খাবার বাসায় তৈরি করলে খরচ কম হতো এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবারও তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি করা যেত।
পাঁচ সদস্যের পরিবারের মঞ্জুর রহমানও একই সমস্যার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সকালে বাসায় নাস্তা তৈরি করতে পারছেন না। নিয়মিত হোটেলের খাবার খেয়ে পরিবারের সদস্যদের পেটের সমস্যা হচ্ছে। শিশুরাও অনেক সময় বাইরের খাবার খেতে চায় না। কিন্তু গ্যাস না থাকায় তাদের সামনে বিকল্পও খুব সীমিত।
শুধু বনশ্রী নয়, সংকট রাজধানীজুড়ে
গ্যাসের এই সংকট কেবল বনশ্রী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও, ধানমন্ডি, মিরপুর ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় তিতাস গ্যাসের গ্রাহকেরা একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বনশ্রীর গৃহবধূ আসমা খানম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বাসায় গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। চুলায় আগুন ধরানোর চেষ্টা করেও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যায় না। ফলে রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
রামপুরার সেলিনা আকতার জানান, আগে রাতে কখনও কখনও গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দিন-রাতের পার্থক্য বোঝা যাচ্ছে না। গ্যাসের চুলা না জ্বলায় প্রায় সব রান্নাই বৈদ্যুতিক চুলায় করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা কেনার সামর্থ্য না থাকায় লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছেন। বাড্ডার আরিফা আক্তার জানান, গ্যাস না থাকায় তাঁদের পরিবার লাকড়ির চুলায় রান্না করছে। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগছে।
তবে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারকারী পরিবারগুলো এই সংকটের সরাসরি প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে বাইরে রয়েছে।
গ্যাস সংকটে হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাড়তি চাপ
বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ থাকায় সকালের নাস্তায় হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বনশ্রীর কয়েকটি খাবারের দোকানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালের সময়ে আগের তুলনায় ক্রেতার চাপ বেড়েছে।
মেহরিন হোটেলের ব্যবস্থাপক আবু বকর বলেন, সকালে আগের চেয়ে কিছুটা বেশি ক্রেতা আসছেন। পাশের পিঠামেলা রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলামও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে সকালের বিক্রি বেড়েছে।
তিনি বলেন, বাসাবাড়িতে অনেকেই নাস্তা তৈরি করতে পারছেন না। তাই গ্যাস সংকটের কারণে মানুষ হোটেল ও রেস্তোরাঁমুখী হচ্ছেন।
ঘরোয়া রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক সুমন জানান, তাঁদের দোকানে সকালের ক্রেতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। অনেকেই সকালে রান্নার ঝামেলা এড়িয়ে সরাসরি দোকান থেকে নাস্তা কিনছেন।
সংকটের পেছনে এলএনজি সরবরাহে বাধা
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গ্যাস সংকটের পেছনে মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল বা এফএসআরইউগুলোর সরবরাহ পরিস্থিতির বড় প্রভাব রয়েছে। দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ কমে যায়। এর পর বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্য টার্মিনাল থেকেও স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি আরও বেড়ে যায় এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকেরা এর সরাসরি প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেন।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নগরবাসীর একটি বড় অংশকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে রান্নার সময় বাড়ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ বাড়ছে এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে লাকড়ি জোগাড় করাও বাড়তি দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী পরিবারগুলো। সকালে দ্রুত রান্না করে অফিসে যাওয়ার যে স্বাভাবিক ব্যবস্থা ছিল, গ্যাস সংকটে তা ব্যাহত হয়েছে। অনেক পরিবারকে এখন প্রতিদিন অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বাইরের খাবার কিনতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের সংকট শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, সময় এবং জীবনযাত্রার ওপরও।

