খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
দক্ষিণ এশীয় নারী ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘সাফ উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ গ্রুপসেরা হওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। ভারতের গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত আটটায় স্বাগতিক ভারতের মুখোমুখি হবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল ইতিমধ্যে নিশ্চিত হলেও, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালের মঞ্চে শক্ত প্রতিপক্ষ নেপালকে এড়ানোই এখন বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দলের রণকৌশল, রক্ষণভাগের প্রস্তুতি এবং অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মনিকা চাকমার একাদশে ফেরা নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার শিউলি আজিম।
ম্যাচের প্রেক্ষাপট ও সেমিফাইনালের সমীকরণ
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতার শেষ চার বা সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে কাকে পাওয়া যাবে। ভারতকে হারাতে পারলে বাংলাদেশ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সেমিফাইনালে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, ম্যাচটি ড্র হলে বা বাংলাদেশ হেরে গেলে রানার্সআপ হিসেবে সেমিফাইনাল খেলতে হবে, যেখানে প্রতিপক্ষ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি নেপালের মুখোমুখি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
আজ সকালে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম সংলগ্ন ডন বক্সো কলেজ মাঠে দলের গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন সেশন অনুষ্ঠিত হয়। অনুশীলন শেষে ডিফেন্ডার শিউলি আজিম ম্যাচের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “এই ম্যাচটি আমাদের দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে, তবু গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে সেমিফাইনালে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়া যাবে এবং সেমিফাইনালের মঞ্চে নেপালের মতো শক্ত প্রতিপক্ষকে এড়ানো সম্ভব হবে।”
শারীরিক সুস্থতা ও দলে ফেরা
মালদ্বীপের বিপক্ষে আগের ম্যাচের দিন হঠাৎ বুকে তীব্র গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার কারণে মাঠে নামতে পারেননি শিউলি আজিম। তবে বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করছেন এবং ভারতের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন।
ভারতের শক্তি ও বাংলাদেশের রণকৌশল
ভারত নারী ফুটবল দল ঐতিহ্যগতভাবেই অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের আক্রমণভাগ বেশ ক্ষুরধার। তবে প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তাকে সমীহ করলেও তাদের দুর্বল দিকগুলো নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ। শিউলি আজিম ভারতের শক্তি ও নিজেদের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা সবাই জানি ভারত একটি শক্তিশালী দল এবং তাদের আক্রমণভাগ বেশ ভালো। তবে প্রতিটি দলেরই শক্তির পাশাপাশি কিছু না কিছু দুর্বলতাও থাকে। আমাদের দলের ভিডিও অ্যানালিস্ট ভারতের সেই দুর্বল দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ विश्लेषण (বিশ্লেষণ) করছেন এবং আমরা সেই অনুযায়ী তাদের আক্রমণ করার নিখুঁত পরিকল্পনা করছি। পাশাপাশি বাংলাদেশ দল হিসেবে আমাদের নিজেদের রক্ষণভাগের ভুলগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য শতভাগ সতর্ক রয়েছে।”
রক্ষণভাগের দুর্বলতা দূর করার প্রস্তুতি
আগের ম্যাচগুলোয় বাংলাদেশের রক্ষণভাগে কিছু দৃশ্যমান ভুলত্রুটি লক্ষ্য করা গেছে। ডিফেন্ডার হিসেবে শিউলি এই সত্যটি স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে দলের প্রধান কোচ বা হেড কোচ এই ত্রুটিগুলো সংশোধনে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। শিউলি জানান, “গত ম্যাচগুলোয় রক্ষণভাগে আমাদের কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ইতিবাচক বিষয় হলো, আমাদের হেড কোচ এই ভুলগুলো নিয়ে আলাদাভাবে অনেক কাজ করছেন। আমরা ডিফেন্ডাররা আশাবাদী যে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে এই ভুলগুলো পুরোপুরি শুধরে নিয়ে আমরা আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাঠে লড়তে পারব।”
মনিকা চাকমার অন্তর্ভুক্তি ও দলের ভারসাম্য
একাদশে নিজের ফেরা এবং মাঝমাঠের প্রধান চালিকা শক্তি মনিকা চাকমার উপস্থিতির প্রভাব নিয়ে অত্যন্ত পরিপক্ব ও পেশাদার উত্তর দিয়েছেন এই ডিফেন্ডার। তিনি মনে করেন, ব্যক্তি খেলোয়াড়ের চেয়ে দলের সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই মূল কথা। তবে মনিকার অন্তর্ভুক্তি যে দলকে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখবে, তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি মাঠে কে খেলছে বা কে খেলছে না, তার চেয়ে দলের গেম প্ল্যান অনুযায়ী নিখুঁতভাবে খেলাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে হ্যাঁ, মনিকা চাকমা মাঝমাঠে ফিরলে স্বাভাবিকভাবেই দলের শক্তি ও ভারসাম্য অনেক বাড়বে, যা আমাদের জন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক। ভারতের রক্ষণভাগ ভেঙে গোল করার মতো সামর্থ্য আমাদের বর্তমান দলের অবশ্যই আছে বলে আমি শতভাগ বিশ্বাস করি।”
মানসিক চাপ সামলানোর কৌশল
ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গ্যালারি এবং মাঠের মানসিক চাপ সামলানো প্রসঙ্গে শিউলি দলের অভিজ্ঞতাকে এগিয়ে রেখেছেন। তবে দলে আসা নতুন ফুটবলারদের কিছুটা নার্ভাসনেস বা চাপ থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দলে এখন অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে, যাদের জন্য এ ধরনের বড় ম্যাচের চাপ সামলানো বেশ সহজ। তবে দলে যে নতুন ফুটবলাররা এসেছে, তাদের মনে কিছুটা চাপ কাজ করতে পারে। কিন্তু একজন পেশাদার ফুটবলার হিসেবে আমি মনে করি যে মাঠের সব ম্যাচই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতি ম্যাচে জেতার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই আমরা মাঠে নামি।”
ভারত দলের পরিবর্তন ও বাংলাদেশের শক্তি
বিগত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের তুলনায় বর্তমান ভারত দলে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি এবং নতুনদের আগমনে ভারতের বর্তমান স্কোয়াডটি ভিন্ন রূপ নিয়েছে। এই পরিবর্তন সম্পর্কে শিউলি আজিম বলেন, “ভারতের বর্তমান স্কোয়াডে আগের অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নেই এবং তাদের বেশ কিছু নতুন মুখ এসেছে। তবে নতুন হলেও তাদের দলটি বেশ গোছানো ফুটবল খেলছে। অন্যদিকে, ভারতের তুলনায় আমাদের বাংলাদেশ দলকেও আমি বর্তমান সময়ে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ মনে করি। আমরা আমাদের সেরাটা দিতে প্রস্তুত।”
নিচে ম্যাচের সময়সূচি, ভেন্যু এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য সমীকরণের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | তথ্য ও বিবরণ |
| ম্যাচ | বাংলাদেশ বনাম ভারত (সাফ উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপ) |
| তারিখ ও সময় | আগামী কাল, বাংলাদেশ সময় রাত ৮:০০ টা |
| ম্যাচের ভেন্যু | জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম, মারগাঁও, গোয়া |
| অনুশীলনের স্থান | ডন বক্সো কলেজ মাঠ (স্টেডিয়াম সংলগ্ন) |
| বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য | ম্যাচে জয়লাভ করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া |
| গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবিধা | সেমিফাইনালে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেপালকে এড়ানো |
| রানার্সআপ হওয়ার ফলাফল | ম্যাচ ড্র বা হারলে রানার্সআপ হিসেবে সেমিফাইনাল খেলা |
| দলের বিশেষ ইতিবাচক দিক | মাঝমাঠে মনিকা চাকমার প্রত্যাবর্তন এবং শিউলি আজিমের সুস্থতা |
বাংলাদেশ দলের এই আত্মবিশ্বাসী মনোভাব এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা স্বাগতিক ভারতের বিরুদ্ধে মাঠের লড়াইয়ে কতটুকু প্রতিফলিত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।