খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
সকালের ব্যস্ত মেট্রোরেল, সন্ধ্যার ক্লান্ত বাসযাত্রা কিংবা গভীর রাতের একাকিত্ব—হেডফোনে ভেসে আসে কিছু গান, যেগুলো নিঃশব্দে মন ছুঁয়ে যায়।
“ঈশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারত না ” বা “ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো…”
এই গানগুলোর নরম সুর, বিষণ্নতা আর অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস শ্রোতাকে মুহূর্তে নিজের ভেতরে টেনে নেয়। অনেকেই গুনগুন করেন, কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন—এই কথাগুলোর পেছনে আছেন এক নীরব, আলো এড়িয়ে চলা মানুষ। তিনি গীতিকার সোমেশ্বর অলি।
নীরব বলেই যে অদৃশ্য—তা নয়। ঢাকাতেই থাকেন তিনি। মাঝেমধ্যে বন্ধু, লেখক, সুরকার আর শিল্পীদের আড্ডায় দেখা মেলে। তবে তাঁর সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা—গানের কথা, গল্প আর শব্দের আলাপ। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর লেখা গান বাংলা সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। আজ তাঁর জন্মদিন—এই উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা আর স্মৃতিচারণায় ভাসছেন তিনি। অথচ দিনটি কাটছে একেবারেই সাধারণভাবে—বাসা বদলের ব্যস্ততায়। এই বৈপরীত্যই যেন তাঁর জীবনচিত্র।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে, সোমেশ্বরী নদীর তীরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সোমেশ্বর অলির। কৃষিভিত্তিক পরিবার, গরু–ধানের সংসার। শৈশবের ভোরে বাবার কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত, মায়ের আর ভাইদের সুর—এই ধর্মীয় আবহের পাশাপাশিই তাঁর কানে বাজত প্রতিবেশী হিন্দু বাড়ির শঙ্খ, উলুধ্বনি আর ঢাকের শব্দ। এই বহুস্বরই পরে তাঁর লেখায় সহনশীলতা ও মানবিকতার রং এনেছে।
ঘরে টেলিভিশন ছিল না। বাবা পছন্দ করতেন না টিভি–রেডিও। তবু নিষেধ ভেঙে পাশের বাড়িতে সিনেমা দেখা, লুকিয়ে রেডিও শোনা—এভাবেই জন্ম নেয় তাঁর ‘শ্রোতা সত্তা’। স্কুলজীবনে মাঠে খেলতে না গিয়ে তিনি ডুবে থাকতেন গান আর কবিতার শব্দে।
কলেজে উঠে নেত্রকোনা শহরে আসার পর তাঁর জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা, কবি–লেখকদের আড্ডা—এসবই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। কবিতা হয়ে ওঠে আপসহীন থাকার ভাষা।
এই কবিতার টানেই ঢাকায় আসা। নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই, স্থায়ী কাজ নেই—শুধু লেখার জেদ। কখনো বন্ধুদের রুমে, কখনো লাইব্রেরিতে রাত কাটে। তিন বছর ফ্রিল্যান্সিংয়ের পর ২০০৭ সালে ‘যায়যায়দিন’-এ সাব–এডিটর হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু। ‘সমকাল’সহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় এক দশক কাজ করেন, যার বড় অংশই বিনোদন সাংবাদিকতা। কিন্তু একসময় গৎবাঁধা শোবিজ নিউজে নিজেকে আটকে মনে হওয়ায় ২০১৭ সালে তিনি সাংবাদিকতা ছাড়েন।
গানের কথা লেখা শুরু হয় কবিতারই এক প্রান্ত থেকে। বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে লুৎফর হাসান, জাহিদ আকবরসহ একদল তরুণ শিল্পীর সঙ্গে—যাঁদের তিনি রসিকতা করে বলেন ‘কলা–রুটি জেনারেশন’। এই সময়েই লেখা ‘রঙিন দালান’। এস আই টুটুলের কণ্ঠে গানটি তাঁকে প্রথম পরিচিত করে।
২০১১ সালে লুৎফর হাসানের অ্যালবাম ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’—এই অ্যালবামই সোমেশ্বর অলিকে প্রতিষ্ঠিত গীতিকার হিসেবে তুলে ধরে। কাব্যিক বিষণ্নতা আর নস্টালজিয়ায় ভরা গানগুলো আজও প্রাসঙ্গিক।
টেলিভিশন নাটকে তাঁর বড় সাফল্য ‘বড় ছেলে’ নাটকের গান ‘তাই তোমার খেয়াল’। এরপর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’র ‘রূপকথার জগতে’, ‘চল বন্ধু চল’—এসব গান নতুন প্রজন্মের প্রিয় হয়ে ওঠে।
বড় পর্দায় তাঁর মোড় ঘোরানো কাজ শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিয়তমা’ ছবির গান ‘ঈশ্বর’। প্রিন্স মাহমুদের সুরে রিয়াদের কণ্ঠে গানটি তাঁকে এনে দেয় ২০২৩ সালের বিএফডিএ সেরা গীতিকারের পুরস্কার এবং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতার কাজের প্রস্তাব।
দুই শতাধিক গান লিখলেও তিনি ট্রেন্ডের পেছনে ছোটেন না। ভাষার শুদ্ধতা, অনুভূতির ওজন—এগুলোই তাঁর কাছে মুখ্য। তাঁর বিশ্বাস, সহজ শব্দেও গভীর কথা বলা যায়, যদি থাকে শ্রম আর সততা।
২০২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘কিছুটা উপর থেকে মানুষ দেখতে ভালো লাগে’। সামনে আছে অপ্রকাশিত গান, ফোক ও গজলধর্মী কাজ, এমনকি মিউজিক্যাল ফিল্মের স্বপ্ন।
আজ জন্মদিনে হয়তো নেই বড় কোনো আয়োজন। কিন্তু কোথাও না কোথাও কেউ আবার শুনছে—
“ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো…”
সেই গানেই নীরবে বেঁচে থাকেন গীতিকার সোমেশ্বর অলি।
| বছর | কাজ/ঘটনা | বিবরণ |
|---|---|---|
| ২০১১ | ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো | গীতিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা |
| ২০১6+ | তাই তোমার খেয়াল | নাটকের জনপ্রিয় গান |
| ২০২১ | রূপকথার জগতে | ওটিটিতে বড় সাফল্য |
| ২০২৩ | ঈশ্বর (প্রিয়তমা) | বিএফডিএ সেরা গীতিকার |
| ২০২৩ | কবিতার বই | কিছুটা উপর থেকে মানুষ দেখতে ভালো |