খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগ চলাকালে সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছেন প্রার্থী ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহসহ চারজন। তাঁরা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী পূর্ব মসজিদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত মোহাম্মদ সরওয়ার হোসেন বাবলা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে দাবি করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৮টি মামলা রয়েছে। তবে বিএনপি জানিয়েছে, সরওয়ার তাঁদের কেউ নন। জনসংযোগে শত শত লোক উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির একাধিক নেতা দাবি করেছেন, এ হামলার জন্য জামায়াতে ইসলামই দায়ী। তবে জামায়াত অভিযোগ অস্বীকার করে দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। গুলির ঘটনায় গভীর নিন্দা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিরাপত্তা বাহিনীকে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনতে নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের প্রতিপক্ষ সরওয়ারকে লক্ষ্য করেই গুলি চালানো হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গুলিবিদ্ধদের মধ্যে রয়েছেন ইরফানুল হক শান্ত (৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক), আমিনুল এবং মর্তুজা হক, যাঁরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এরশাদ উল্লাহ নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাঁর পাশে ছিলেন সরওয়ার হোসেন বাবলা। হঠাৎ এক যুবক ভিড়ের মধ্যে ঢুকে সরওয়ারের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। এরপর পরপর সাত-আটটি গুলি ছোড়া হয়।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মো. জসিম উদ্দিন জানান, এরশাদ উল্লাহ নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন, এ সময় দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়। এতে তিনি পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, গুলিবিদ্ধ সরওয়ার হোসেন বাবলা হাসপাতালে মারা গেছেন। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের কাজ চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাগরিবের নামাজ শেষে এরশাদ উল্লাহ নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলে সরওয়ারকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। পাশে থাকা এরশাদ উল্লাহ ও শান্তও গুলিবিদ্ধ হন।
ঘটনার পর বিএনপি নেতারা বিক্ষোভ মিছিল করেন। তাঁরা দাবি করেন, এই হামলার পেছনে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর হাত রয়েছে। বিক্ষোভ শেষে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা এই হামলা চালিয়েছে, যার উদ্দেশ্য নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করা।
এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালের সামনে বিএনপি নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। নাজিমুর রহমান বলেন, এটি জামায়াত-শিবিরের কাজ। তবে নিহত বাবলা বিএনপির কেউ নন।
মহানগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, এরশাদ উল্লাহ দোকানে দোকানে লিফলেট বিলি করছিলেন, তখন তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তিনি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।
নিহত বাবলার বাবা আবদুল কাদির জানান, সাজ্জাদ তাঁর ছেলেকে হুমকি দিয়েছিল। নামাজ শেষে বের হয়ে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করার সময় গুলিবিদ্ধ হন তাঁর ছেলে।
অপরাধীদের বিচারের নির্দেশ ড. ইউনূসের
সহিংস হামলার ঘটনায় গভীর নিন্দা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস নিরাপত্তা বাহিনীকে দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এরশাদ উল্লাহ লক্ষ্য ছিলেন না; বিক্ষিপ্তভাবে ছোড়া একটি গুলি তাঁর শরীরে লাগে।
সরকার এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া সব প্রার্থী ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। সিএমপি হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সব রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকদের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতেই হামলা : বিএনপি মহাসচিব
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই হামলার উদ্দেশ্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করা। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী গোষ্ঠীর পতনের পর দুষ্কৃতকারীরা আবারও দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। হামলাটি সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ।
তিনি দুষ্কৃতকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বিবৃতিতে বলেন, গণসংযোগে প্রার্থীর ওপর হামলা নির্বাচনী ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, এ ধরনের ঘটনার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন রাজনৈতিকভাবে ফায়দা তুলতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, সরওয়ার হোসেন বাবলা একজন সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে লক্ষ্য করেই প্রতিপক্ষ গুলি চালায়, এতে বিএনপি প্রার্থীও আহত হন।
তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
সিএমপির বক্তব্য
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, এরশাদ উল্লাহ টার্গেট ছিলেন না; নিহত সরওয়ার বাবলা ছিলেন মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বাবলার প্রতিপক্ষ এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে এমন ঘটনা অশুভ ইঙ্গিত দেয়, তবে পুলিশ সতর্ক রয়েছে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।
খবরওয়ালা/টিএসএন