পেরুর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হোসে জেরি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় কংগ্রেসের ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। অভিযোগ—তিনি চীনা ব্যবসায়ী ঝিহুয়া ইয়াং-এর সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন, যা সরকারি সূচি ও নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত বিশেষ অধিবেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জেরিকে অপসারণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছেন এবং স্বচ্ছতা নীতির পরিপন্থী আচরণ করেছেন। পেরুর আইনে রাষ্ট্রপতিকে তার সব সরকারি বৈঠক ও বৈদেশিক যোগাযোগের তথ্য সরকারি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বৈঠকগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে জেরি হুডি পরে ইয়াংয়ের একটি রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করছেন। ওই বৈঠকে আরেক চীনা নাগরিকও উপস্থিত ছিলেন, যিনি অবৈধ কাঠ পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গৃহবন্দি ছিলেন। এই তথ্য সামনে আসার পর বিরোধীরা বিষয়টিকে ‘চিফা-গেট’ নামে আখ্যা দেয়—‘চিফা’ শব্দটি পেরুতে চীনা-পেরুভিয়ান রেস্তোরাঁ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
জেরি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বৈঠকটি ছিল “ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক”, এবং এতে কোনো রাষ্ট্রীয় চুক্তি বা নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিত করেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, একই সময়ে রাষ্ট্রীয় চুক্তি ও অবকাঠামো সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্তে চীনা বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, যা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এটি পেরুর সাম্প্রতিক ইতিহাসে টানা তৃতীয় প্রেসিডেন্ট অপসারণের ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে দিনা বলুয়ার্তে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০১৬ সাল থেকে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে একাধিক প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিয়েছেন ও অপসারিত হয়েছেন।
নিচে ২০১৬-২০২৬ সময়কালে পেরুর প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| সময়কাল | প্রেসিডেন্ট | দায়িত্বের ধরন | অপসারণ/পরিবর্তনের কারণ |
|---|---|---|---|
| ২০১৬-২০২০ | বিভিন্ন | নির্বাচিত | রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অভিশংসন |
| ২০২৫ (অক্টোবর) | দিনা বলুয়ার্তে | নির্বাচিত | কংগ্রেসে অভিশংসন |
| ২০২৫-২০২৬ | হোসে জেরি | অন্তর্বর্তী | গোপন বৈঠক বিতর্ক |
জেরি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। কংগ্রেসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তার অপসারণের পর কংগ্রেস ঘোষণা করেছে, আগামী বুধবার নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের নাম প্রকাশ করা হবে। নতুন নেতা এপ্রিলের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘনঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন পেরুর গণতান্ত্রিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষত খনিজ ও অবকাঠামো খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে, অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন প্রবল।